বর্তমান অবস্থার আলোকে পাবজি কথন

নিজস্ব প্রতিবেদক

২-৬-২০২১

This image is not found

পাবজি নামক কোন গেম আছে এমন ধারণার সাথে আমি পরিচিত হই ২০১৮ এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে। কলেজের বন্ধুরা টিফিনের সময় যখন খেলতো তখন নজরে আসে। দেইখা কেন যানি একটা আকর্ষণ অনুভব করি। পরে বাসায় আইসা ডাউনলোড করি এবং সেই বন্ধুদের সাথে খেলতে থাকি। খেলার সহসটা রপ্ত করার পর অদ্ভুত আনন্দ পাইতে শুরু করি।

ভার্চুয়াল মানুষগুলারে মারতে পারা কি আজব এক অনুভূতির সৃষ্টি করে, পৈশাচিক আনন্দ ,পরিতৃপ্তি না খেললে হয়তো বুঝানো সম্ভব নয় ।দিন দিন খেলার সময় দীর্ঘ হতে থাকে। আগ্রহ চক্রবৃদ্ধি মুনাফার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। চক্রবৃদ্ধি মুনাফা যেমন বোঝা যায়না তেমনি পাবজি আসক্তিও ।

তখনোও বুঝে উঠতে পারি নাই এর আসক্তি। আব্বু তো প্রায় বলতো যেমনে এই গেমস খেলো মনে হয় নেশা করো। আম্মুর কথা না হয় বাদই দিলাম । পাবজি না খেলার জন্য আব্বু কয়েকবার ফোন অফিসে রাইখা আসছে। বেশ কয়েকবার মাসখানেকের জন্য ফোন অফিসে ছিল ।

এমন না যে আমি সারা দিন-রাত খেলতাম। কিন্তু আকর্ষণ এবং আসক্তি অল্প সময়ে খেলার মধ্যেও ধরা পরে। আমার এইচএসসি পরীক্ষার দিনগুলোতে যথারীতি খেলতাম। আমার গণিত পরীক্ষার আগের রাতেও আধা ঘন্টার মত খেলছি। আব্বু হঠাৎ রুমে আইসা যখন দেখে, তখন পুরাই অসহায়ের মত স্তব্ধ হয়ে ছিলো। কি বলবে!

তারপর কেন জানি একটা আত্মোপলব্ধি হল, ছেড়ে দিলাম খেলা। এইচএসসির পর মানে ২০১৯ এর মে-জুনের দিকে। নেশার (আসক্তি) অপকারিতা উপলব্ধি ততক্ষণে হয়ে গেছে। যদিও ততক্ষণে খেসারতের পরিমান ভালোই হয়েছে। 

এখন আসি এ ধরনের খেলা কতটা জরুরী। পাবজি বাংলাদেশ ২০১৯ এর শেষের দিকে অত্যন্ত পপুলিস্ট গেম হয়ে গেছে। মাঝ বয়সী থেকে শুরু করে সিক্স-সেভেনের বাচ্চারাও এর আওতা সীমার মধ্যে এসে গেছে । আর 2020 এর লকডাউন এর মধ্য এর মার্কেট "বুম" করছে জাস্ট। 

ফ্রি ফায়ারে ব্যাপারটাও অনেকটা এমনই। যাদের ভালো প্রসেসর, রেম-রমযুক্ত এন্ড্রয়েড বা আইফোন আছে তারা পাবজির দিকে ঝুঁকে পড়ে আর যাদের সীমাবদ্ধ রেঞ্জের এন্ড্রয়েড ব্যবহার করতে হয় তারা ঝুঁকে পড়ে ফ্রী ফায়ারের দিকে। এ বিবেচনায় গ্রামের এবং মফস্বলের ছেলেরা (বাস্তবগত দিক দিয়ে বলছি অপমানসূচক ইঙ্গিতে নয়) ফ্রী ফায়ার এবং নগর ও রাজধানীর ছেলে-মেয়েরা পাবজির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।

এই আসক্ততা ফেসবুকের প্রতিও তেমন ভাবেই কাজ করে। এজ অ্যা গেম পাবজি বা ফ্রী ফায়ারের আকৃষ্ট করার প্রবণতাটা বেশি। এছাড়া এদের পাশাপাশি টিকটক,লাইকি বিশেষ করে মেয়েদের দারুন ভাবে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে । 

এই আসক্তি নিয়ে কথা বলতেই আমরা অধিকতর ব্যস্ত কিন্তু এ বাতায়ন কেন তৈরি হল,পরিপেক্ষ কেন উদয় হল। তা নিয়ে সামান্যতম মাথা ঘামানোর প্রয়োজন আমরা বোধ করিনা। 

শিশুরা হাতে কিভাবে এন্ড্রয়েড পায় তার জন্য দ্বায় পরিবারের। কিভাবে এমন আসক্তিকর গেম খেলতে পারে তার দ্বায় পরিবার পাশাপাশি রাষ্ট্রের। শিশুকে নিয়ন্ত্রণভার যেমন বাবা-মার তেমনিভাবে পাবজি ফ্রী-ফায়ার ,টিকটক,লাইকি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের।

এছাড়া শুধু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কি এরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা আদৌ সম্ভব? এর জন্য বিকল্প বাতায়ন সৃষ্টি করতে হবে অগত্যা কোন ধরনের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবন্ধকতা সমস্যা নির্মূলে কাজ করবে না।

বাবা-মা যেমন শিশুর বিকাশে অবহেলা করছে তেমনি রাষ্ট্রযন্ত্র তার নাগরিকের বিকশিত হবার পথ প্রতিবন্ধকতায় আড়ষ্ট করছে। 

দেশে সুস্থ বিদ্যায়ন নেই, সুস্থ খেলার মাঠ নেই, সুস্থ ব্যায়ামাগার নেই, সুস্থ ক্লাব, সংগঠন নেই, সুস্থ প্রাঙ্গন,পার্ক,উদ্যান,চিড়িয়াখানা, সবুজাভ নেই। অর্থাৎ সুস্থ জীবন নাই সেই সাথে নেই সুস্থ মস্তিষ্ক। 

এখন আসি লকডাউনের পার্সপেক্টিভে। লকডাউনে যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারা দিনের বেশিরভাগ সময়ে কার্টুন,এনিমেশন,ভিডিও গেম দেখায় ব্যস্ত। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা পাবজি ফ্রী ফায়ার এর মত গেমগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে রাখছে। বিশেষ করে কিশোরীরা টিকটক,লাইকিতে সময় যাপন করছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব,ইনস্ট্রগ্রামতো আছেই। 

তাদের পরিবার যেমন তাদের বিকল্প কোন কিছুতে আকৃষ্ট করতে পারছে না । তেমনি ভাবে রাষ্ট্র শিক্ষায়ন বন্ধের মাধ্যমে দিনের ব্যস্ততম সময়গুলোকে নিসাড় করে রেখেছে। প্রডাক্টিভ কোনো কার্যক্রম না পরিবার দিতে পারছে, না রাষ্ট্র ।

এখন আসি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের অবস্থা উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের মতোই,তাদের দিনপাত একই রকম। আমার মতে এইচএসসি বা এসএসসি পরীক্ষার্থীদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের অবস্থা খানিকটা ভালো আছে। কেননা তাদের মাথার উপর বোর্ড পরীক্ষার বোঝা ঝুলে নেই । তাদের মাথার ওপর (বয়স অনুযায়ী ) পারিবারিক বোঝা নেই(কারো কারো থাকলেও তার সংখ্যা আততে বেশি না)। 

তারা যথারীতি দিনরাত গেমস, টিকটক, মুভি, সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় ব্যয় করছে। এমন নয় যে একদম কেউ বই পড়তেছে না বা চিন্তা কিংবা মনন জগতে নিজেকে ব্যয় করতেছে না কিন্তু জেনারালাইজ ভাবে যদি বলি তবে বেশির ভাগই পাবজি ,ফ্রী-ফায়ার এবং ইন্টারনেট কেন্দ্রীক জগতে অবস্থান করছে ।

তাদের এভাবে দিন কাটানোর জন্য আমাদের সমাজের দ্বায়বদ্ধতা থাকলেও কিছুই করার নেই কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রতিষ্ঠান (শিক্ষাসংক্রান্ত) বন্ধ করে রাখছে। এখানে সমাজের কিছুই করার নেই সামান্য মানববন্ধন করা ছাড়া ,আর ব্যাপার গুলোয় না হয় নাই ডুকলাম।

এতো গেলো প্রথম বর্ষের হিসাব দ্বিতীয় বর্ষে আসি।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা অনেকটা প্রথম বর্ষের মতোই অবস্থান করছে কিন্তু তারা প্রথম বর্ষের থেকে কিছুটা বেশি হতাশ এবং বিভ্রমে আছে। জীবনের লক্ষ্য তাদের থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে। তারা লক্ষ্য নির্ণয়ের মাপকাঠিতে স্থির হতে পারতেছে না।

তৃতীয়,চতুর্থ বর্ষ এবং মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের নিয়ে কথা বলার সাহস আমার হচ্ছেনা। কারণ তারা কি পরিমান মানসিক বিপর্যয় আছে, তা তাদের একজন না হওয়া পর্যন্ত বোঝা সম্ভব নয়। 

চাকরির জন্য ডিপ্রেশন, গ্রেজুয়েশনের জন্য ডিপ্রেশন ,পরিবারের ভার নেবার অক্ষমতা, টিউশন না পাবার সীমাবদ্ধতা সবকিছুই জর্জরিত করে রেখেছে তাদের। এদের কথা ভাবলেও গা শিরশিরিয়ে ওঠে। হ্যাঁ, কয়েকজন যে উদ্যোক্তা হয়ে উঠছে না কিংবা কিছু করার চেষ্টা করছে না তা নয় কিন্তু সংখ্যায় তা একদম যৎসামান্য। অ্যা এক্সেপশন ক্যান নট বি অ্যা এক্সামপল। 

এই শ্রেণীর জন্য অনুশোচনা হয় কখন যে কে,কি করে ফেলে হতাশার চোটে খোদাই ভালো জানে। 

আবার পাবজি, ফ্রী-ফায়ারে ফিরে আসি। পাবজি কিংবা ফ্রী ফায়ার দুটোই এক অপরের পরিপূরক। আলাদা করে দেখার কিছু নাই। এগুলো ব্যান হলে খারাপ হবে না ভালো হবে সেই বিতর্কে না জরিয়ে পাবজি এবং ফ্রী ফায়ারের বিকল্পে আমরা (পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্র) শিক্ষার্থী এবং তরুণ সমাজকে  কি দিতেছি তা ইম্পরট্যান্ট, আলোচনার যোগ্য ।

কোন জিনিস ব্যান করার আগে তার বিকল্প সৃষ্টি জরুরী। একটা প্ল্যাটফর্মরে নিষিদ্ধ করবার আগে এর অনুরূপ প্লাটফর্ম তৈরি করা যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের সময়কে অলস ভাবে হোক বা প্রডাক্টিভ ভাবে হোক যে কোন ভাবে কাটাতে পারে এমন ব্যবস্থা করা।

একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের উপর নিয়ন্ত্রিতভাবে এসব গেমস রাখা যেতে পারে কি পারে না তা নিয়ে বিতর্ক করা বুদ্ধিমত্তার কাজ। তা সমালোচনা এবং ভাবার অবকাশ রাখে ।

কিন্তু যতক্ষণ অব্দি বিকল্প সৃষ্টি না হয় কিংবা না করতে পারি ততক্ষণ আমরা বর্তমান সময়ে পাবজি,ফ্রী ফায়ার ব্যান হবে কিনা তা চিন্তা না শিক্ষাঙ্গন  অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিভাবে খোলা যায়, চালানো যায় তার চিন্তা করি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে। গত এইচএসসি পরীক্ষায় মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনি ,এভাবে আরো কয়েকটা ব্যাচ বের হলে জাতির মেরুদণ্ডের হাড্ডিগুলো একটা একটা করে ভেঙ্গে পড়তে থাকবে। এমন চলতে থাকলে শিক্ষার্থীর হার যেমন অনেক কমে যাবে তেমনি আর যা থাকবে বেশিরভাগই মস্তিষ্কহীন, অলস, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাহীন যন্ত্র হয়ে বেঁচে থাকবে ।

আমরা চাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব মর্যাদায় আবার ফিরে আসুক । শিক্ষক-শিক্ষার্থী দ্বারা পরিপূর্ণ হোক শিক্ষালয়, শিক্ষাঙ্গন ।

 

লেখক: মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি,(১ম বর্ষ)

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ।

এই বিভাগের আরও