কিশোর গ্যাং সমস্যা ও বাংলাদেশ || ✍: মির্জানা আফরিন || ক্যারিয়ার ক্লাব অফ আর্টস ফ্যাকাল্টি (ক্যাফ) ||

এস এইচ/এস ই

২৩-১০-২০২০

This image is not found

 

বর্তমান বিশ্বে অধিক আলোচিত বিষয় হচ্ছে কিশোর গ্যাং। কিশোর গ্যাং বলতে বুঝায় এমন একটি দল যেখানে কয়েকজন কিশোর মিলিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকে। আধুনিক বিশ্বের অসংগঠিত সমাজ ব্যবস্থায় দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফল হলো কিশোর গ্যাং। পরিবার কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন শহর ও বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং সমাজ জীবনে বিরাজমান নৈরাজ্য ও হতাশা কিশোর গ্যাং তৈরির প্রধান কারণ। অপসংস্কৃতির বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারও এজন্য অনেকাংশে দায়ী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, "তের চৌদ্দ বছরের মত এমন বালাই আর নেই। তার মুখে আধো -আধো কথাও ন্যাকামি।পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগলভতা।" এ বয়সের ছেলেমেয়েদের অদম্য আশা আর জীবন জগৎ সম্পর্কে থাকে অতিকৌতূহল। সমাজিক অবক্ষয়, সমাজ পরিবর্তন এবং সমাজের নানাবিধ অসঙ্গতি এবং অস্বাভাবিকতার খেই হারিয়ে ফেলছে সমাজের কিশোর তথা তরুণরা।  এরা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে। এই কিশোরও সমাজের মধ্যে নিজেদের মতো করে নতুন করে আরেক সমাজ গড়ে তুলছে।এই সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা,বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ সবকিছু আলাদা। বিগবস, নাইন স্টার, নাইন এমএম, ডিসকো বয়েজ ইত্যাদি নামে গড়ে তুলছে অদ্ভুত এবং মারাত্মক কিশোর গ্যাং। 

সমাজবিজ্ঞানী রাশেদা ইরশাদ নাসির মনে করেন "মূলত দুটি কারণে কিশোররা এসব গ্যাং সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ছে। 

প্রথমতো, মাদক, অস্ত্রের দাপটসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড।

দ্বিতীয়ত,এখনকার শিশু কিশোররা পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট মনোযোগ পাচ্ছেনা। 

ফলে কিশোরদের কেউ যখন বন্ধুদের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং গুলোতে ঢুকছে এবং মাদক ও অস্ত্রের যোগান সহজেই পেয়ে যাচ্ছে তখন তার প্রলুদ্ধ হওয়া এবং অপরাধ প্রবণ হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

 

 

মূলত স্কুলে পড়তে গিয়ে বা এলাকায় আড্ডা দিতে গিয়ে শুরুতে মজার ছলে এসব গ্রুপ তৈরি হলেও, একসময় মাদক,অস্ত্র এমনকি খুনাখুনিতে জড়িয়ে পড়ে। 

প্রথমে তারা অন্যের হামলা থেকে নিজের রক্ষা করার জন্য কয়েকজন মিলে একটি গ্যাং তৈরি করে। এটি আসলে একটি ট্রেন্ড। কেউ গুন্ডামি করছে,গ্যাং বানাচ্ছে, মারামারি করছে,দেয়ালে চিকা মেরে গ্যাং এর নাম লিখছে। এসকল প্রবণতা থেকে অন্যরাও গ্যাং তৈরি করে। পরবর্তিতে এগুলো বড় আকার ধারণ করে। অতি তুচ্ছ কারণে তার অন্য গ্রুপের সাথে মারামারি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে হত্যাকান্ড পর্যন্ত হয়ে যায়। তারা নিজেদের দলকে জাহির করতে চায়। ঠিক তিন বছর আগে ২০১৭ সালে উত্তরায় ডিসকোস বয়েজ ও নাইন স্টার গ্রুপের অন্তদ্বন্দে খুন হয় ট্রাস্ট স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির।

এমরানুল হাসান বলেন ; ২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান হত্যাকান্ডের মাধ্যমে দেশে গ্যাং কালচারের পরিচিতি ঘটে। এরপর থেকে একের পর এক হত্যাকান্ড চলছেই এবং সংঘটিত হচ্ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড। চ্যানেল আই এর অনলাইনের প্রতিবেদনে জানা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুর চান মিয়া হাউজিং সোসাইটিতে খুন হয় স্কুলছাত্র মহসিন। 

 

এছাড়া গত ৭ জুলাই বান্ধবীর সঙ্গে ছবি তোলার জেরে দুই গ্যাং গ্রুপের দ্বন্দে শুভ আহমেদ(১৬) নামের এক নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। 

সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জাকির হোসাইন এক প্রতিবেদনে ( ১৭ আগস্ট ২০২০, ১২ঃ৪৫ অপরাহ্ণ)  বলেন, 

সাম্পতিককালে কিশোর নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।  এই বছরের শুরুতে আমাদের কিছু জাতীয় পত্রিকায় কিশোর গ্যাং এর অপরাধ ও তাদের বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ে সিরিজ আকারে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।  গত বছর আমাদের গণমাধ্যমগুলো জানায়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে শতাধিক কিশোর গ্যাং অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত। তারা নানান রকমের কর্মকান্ড পরিচালনা করে। 

 

 

বাংলাদেশের বিগত কয়েক বছরের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আমাদের অনুর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সের শিশু ও কিশোরগন বিভিন্ন প্রকার অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। হত্যা, ধর্ষন, ডাকাতি,চাঁদাবাজি, মাদক সেবন ও মাদক বিক্রয়ের মত অপরাধগুলোতে জড়িত। এমন কিছু কিছু ঘটনা খুবই মারাত্মক ও ভীতিকর। 

গত ফ্রেবুয়ারি মাসে একজন শিশু অভিযুক্তকে হত্যা মামলায় ও গত ১৩ আগস্ট বরগুনায় ধর্ষন মামলায় দুইজন শিশু অভিযুক্তকে ১০ বছর (সর্বোচ্চ শাস্তি) কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বরগুনায় আলোচিত রিফাত হত্যার মামলায় বেশকিছু কিশোর অভিযুক্তের বিচার শেষ পর্যায়ে আছে। 

এই বিষয়গুলো ইঙ্গিত করছে যে, কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ংকর পর্যায়ে আছে 

গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে টিকটক ও লাইকি অ্যাপের ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। সাধারণ কিশোররা এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করে অনলাইনের মাধ্যমে নিজেদের জাহির করে তারকা খ্যাতি অর্জন করার চেষ্টা করতেছে এবং অর্থ উপার্জনের বৃথা চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিককালে এই অ্যাপগুলো ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। কিছুদিন আগে ঢাকার উত্তরায় অপু ভাই নামের এক ছেলে টিকটক ভিডিও নির্মাণের জন্য রাস্তা অবরোধ করে ৭০-৮০ জন কিশোর মিলে একজন প্রকৌশলীকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়।  গণমাধ্যম থেকে জানা যায় অপুর বাড়ি নোয়াখালীতে। সে একটি সেলুনে কাজ করতো, পরে টিকটক ভিডিও দেখে ঢাকায় চলে আসে। আর তাকে আশ্রয় দেয় একটি গ্যাং। এর পর থেকে ইয়াছিন আরাফাত থেকে হয়ে যায় অপু ভাই। 

প্রতিনিয়তই এরকম অপু ভাইয়ের উদ্ভব হচ্ছে সারা দেশে। আর এদের মাধ্যমেই নেতিবাচক কাজ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে। এতে আমাদের দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজের চরম অবক্ষয় হচ্ছে।  অভিভাবকগণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের মননশীলভাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কিশোর গ্যাং কালচারের উত্থান এবং সমাজে বিদ্যমান কিশোর অপরাধকে ভিন্নভাবে ব্যাখা করা যায়। সব অপরাধ সংঘঠনের পিছনেই কিছু না "ট্রিগার ফ্যাক্টর" কাজ করে। অপরাধীরা যে অপরাধ করছে তা সে অপরাধ ভেবেও করতে পারে, না ভেবেও করতে পারে। মাইক ও ডেভিড সংজা ১৯৫৭ সালে কীভাবে অওরাধী তার অপরাধকে নিউট্রিলাইজড কিংবা নিষ্ক্রিয়করণ করে, বিশেষ করে কিশোর অপরাধীরা কীভাবে সঠিক প্রমাণ করে সে বিষয়ে নিউট্রিলাইজেশন থিওরি প্রধান করেন। 

এ ধরণের অপরাধী তার কাজকর্ম এবং নিজেকে সঠিক প্রমাণ করে সবার কাছে ভালো থাকতে চায়।  এরপর তারা ভাবে এসব কোন অপরাধ-ই না। এটা কোন ক্ষতিই না। 

কিশোর অপরাধের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত গ্যাং কালচারের নামে নতুন ধরণের প্রক্রিয়াই সারকালচারের নামান্তর। মূলত সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে যখন কোনো গ্রুপ নতুন কোনো সংস্কৃতি চর্চা করে তখন সেটাকে সাবকালচার হিসেবে অভিহিত করা হয়।  লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে,কিশোর গ্যাংদের চলাফেরা,আচার-আচরণ, পোশাক পরিচ্ছদ, এমনকি চুলের স্টাইল সবই আলাদা।

এ থিওরির একটি অংশ আলবার্ট কোহেনের " স্টাটাস ফ্রাস্টেশন থিওরি "। একজন মানুষ যখন নিন্মবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে জীবনযাপন করে করে তাদের মূল্যবোধ ও আকঙ্খা ধারণ করে, কিন্তু জীবনে সাফল্য আনতে অপারগ হয় কিংবা বিদ্যমান সমাজের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। তাদের মধ্যে এক ধরনের ফ্রাস্টেশন তৈরি হয়। এই অনূভুতিই " স্টাটাস ফ্রাস্টেশন "। এর ফলে তারা নতুন মূল্যবোধ ধারণ করে নতুন সাবকালচার তৈরি করে। যেখানে তারা সফল হওয়ার জন্য নতুন নতুন উপায় বের করে। যেমন অপু ভাই। ঠিক এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন গ্যাং। ঢাকার অলিতে গলিতে কিংবা অন্যন্য শহর যেমন চট্টগ্রাম, সিলেট,কিশোরগঞ্জ, খুলনায় অসংখ্য গ্যাং রয়েছে। ফলে কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধ কে ঘিরে এক ভয়াবহ উদ্বেগ ও আতংক ছড়াচ্ছে যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ব্যাক্তি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, কমিউনিটি তথা দেশ বিদেশে সবত্রই।

কিশোররা এভাবে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের সম্ভবনাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, কিন্তু দিন দিন ভবিষ্যতের আলো নিভে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কিশোরদের কোমলমতি জীবনে নেমে আসছে অন্ধকার। তাই আমাদের সকলের উচিত এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়া।  পরিবার হচ্ছে মানুষের আদি সংগঠন এবং সমাজজীবনের মূলভিত্তি। তাই পরিবারকে আগে থেকেই খেয়াল রাখতে হবে ছেলেমেয়েরা কোথায় যাচ্ছে, কি করছে কার সাথে মিশছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার করছে কিনা। পরিবারের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ কিশোরদের জন্য কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা এবং তাদের সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ  রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থাকতে হবে। কিশোরদেরকে সামাজিক ইতিবাচক কাজে সম্পকৃত রাখতে হবে। এর জন্য সমাজ ও দেশের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রাখা চাই।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে শিশু আইন প্রনয়ন ও কার্যকর করেন। জাতিসংঘ শিশু অধিকার ১৯৮৯ ও শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যকে শিশু। তাদের অপরাধ সংক্রান্ত বিচার আইন ২০১৩ অনুযায়ী হবে। শিশু অভিযুক্তদের নিয়প কাজ করার জন্য বেশকিছু সেইফ হোম ও ৩ টি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে (টঙ্গী,গাজীপুর ও যশোর)। উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের মানসিক বিকাশে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুদের মানসিক উন্নয়ন অপরাধ থেকে ফেরাতে সরকার কে সমন্বিত উদ্যেগ নিতে হবে। 

মোঃ জাকির হোসাইন (সিনিয়র জুডিসিয়াল আদালত, ফেনী) বলেন ঃ- 

বর্তমান কিশোর গ্যাং ও অপরাধমূলক কার্যক্রম বিবেচনায় নিলে এটা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, শিশু কিশোররা  বিভিন্ন  প্রকার অপরাধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে এবং এর হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখনি সঠিক পদক্ষেপ না নিলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মুখে পড়বে।শিশু কিশোরদের বিভিন্ন লোমহর্ষক অপরাধমূলক কার্যক্রমের হারও বৃদ্ধি পাবে।অবিভাবকের সচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ। সাইবার অপরাধ সম্পর্কে ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আরো মননশীল উদ্যেগ ও সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই অবস্থা হতে উত্তোরণ সম্ভব। 

 

তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো (২০১৭;১৭ আগস্ট, ২০২০;ফেব্রুয়ারী, ২০২০;)  

সমাজবিজ্ঞানী রাশেদ ইরশাদ নাসির,এমরানুল হাসান,সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফেনী মো:জাকির হোসাইন।

 

 

মির্জানা আফরিন
টিম : ড. এ আর মল্লিক
ক্যারিয়ার ক্লাব অব আর্টস ফ্যাকাল্টি 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
এই বিভাগের আরও