রোবটিক্স ও আগামীর বিশ্ব ||✍: এম এ ইব্রাহিম || ক্যারিয়ার ক্লাব অফ আর্টস ফ্যাকাল্টি (ক্যাফ)||

এস এইচ/এস ই

১৭-১০-২০২০

This image is not found

রোবটিক্স হলো প্রযুক্তির একটি শাখা যেটি রোবট সমূহের ডিজাইন, নির্মাণ, কার্যক্রম ও প্রয়োগ নিয়ে কাজ করে। New Collegiate ডিকশনারীর মতে “রোবট হচ্ছে একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যা মানুষ যেভাবে কাজ করতে পারে সেভাবে কাজ করে অথবা এর কাজ দেখে মনে হয় এর বুদ্ধিমত্তা আছে। সর্বপ্রথম ডিজিটাল ও প্রোগ্রামেবল রোবট আবিষ্কার করেন জর্জ ডেবল, এজন্য তাকে রোবটিক্সের জনক বলা হয়। 

রোবটিক্স শব্দটি এসেছে 'রোবট' শব্দ হতে যা প্রবর্তিত হয় চেক লেখক ও নাট্যকার কারেল কাপেক এর একটি নাটক থেকে যা ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয়। রোবট (Robot) শব্দটি এসেছে মূলত স্লাভিক শব্দ “রোবোটা” হতে যার অর্থ হলো শ্রমিক। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী “রোবটিক্স” শব্দটি সর্বপ্রথম প্রিন্টে ব্যবহার হয় 'আইজ্যাক অসিমভ এর ছোট সায়েন্স ফিকশন গল্প “লায়ার” এ যা ১৯৪১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।

ইতিহাসসম্পাদনা

 

সারা বিশ্ব জুড়ে অনেক সংস্কৃতির পৌরাণিক কাহিনীতে স্বয়ংক্রিয় বস্তু সম্পর্কে ধারণা দেয়া আছে। প্রাচীন সভ্যতার শুরু থেকেই প্রাচীন সংস্কৃতির প্রকৌশলী এবং আবিষ্কারকগণ উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন চীন, প্রাচীন গ্রিস এবং টলেমিক মিশরের প্রকৌশলীরা স্বয়ংক্রিয় মেশিন নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন তারা অনেকটা ছিল প্রাণী ও মানুষের অনুরূপ। শুরুর দিকে স্বয়ংক্রিয় বস্তু সম্পর্কে প্রথম যে বিবরণটি পাওয়া যায় তাদের মধ্যে আর্কাইসের কৃত্রিম ঘুঘু, কৃত্রিম মোজি এবং Lu Ban পাখি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কথা বলতে সক্ষম আলেকজান্দ্রিয়ার হিরো, washstand নামে বাইজেন্টিয়ামের ফিলো এবং মানব লি.জী অন্যতম।

 

অনেক প্রাচীন পুরাণ এবং বেশিরভাগ আধুনিক ধর্মের মধ্যে কৃত্রিম মানুষ রয়েছে, যেমন গ্রিক দেবতা হেফায়স্তাস রোমানদের ভুলকান, ইহুদিদের কাদামাটির কিংবদন্তি গুলেমস, কাদামাটির কিংবদন্তি দৈত্য নোরস এবং গ্যালাটা এবং পিগমালিয়নের পৌরাণিক মূর্তি যে জীবন ফিরে পেয়েছিল। প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের থেকে, ক্রীটের কাহিনীগুলি যেমন তালোস এবং ব্রোঞ্জের একটি মূরতি যিনি জলদস্যুদের কাছ থেকে ইউরোপের ক্রীতান দ্বীপের জন্য পাহারা দিচ্ছিলেন।

 

 

প্রাচীন গ্রীসে ভাষায় গ্রিক প্রকৌশলী Ctesibius (c ২৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)নিউম্যাটিক্স এবং হাইড্রোলিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে প্রথম চলমান অঙ্গ এবং জল ঘড়ি তৈরি করেছিলেন। চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক গণিতবিদ ত্যান্টুমের আর্কিটাসের একটি যান্ত্রিক বাষ্পচালিত পাখি তৈরি করেছিলেন যাকে তিনি "The Pigeon" নামে অভিহিত করেছিলেন। আলেকজান্দ্রিয়ার হিরো (১০-৭০ খ্রিষ্টাব্দ) একজন গ্রিক গণিতবিদ ও উদ্ভাবক ছিলেন যিনি বহু ব্যবহারযোগ্য স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস তৈরি করেছিলেন যা বায়ুর চাপ, বাষ্প এবং জল দ্বারা চালিত হত।

 

একাদশ শতকের Lokapannatti বলে যে বৌদ্ধের ধ্বংসাবশেষটি কিভাবে যান্ত্রিক রোবোটস (bhuta vahana yanta) দ্বারা সুরক্ষিত ছিল Roma visaya (Rome) রাজত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না তারা রাজা অশোকের দ্বারা নিরস্ত্র হয়েছিলেন। অটোমাটারের সূচনা হয়েছিল সু সং এর জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত ঘড়ি টাওয়ারের আবিষ্কারের মাধ্যমে যাকে যান্ত্রিক মূর্তিগুলি ঘিরে ধরেছিল। তার পদ্ধতিতে পিক্স (ক্যাম) দিয়ে একটি প্রোগ্রামযোগ্য ড্রাম মেশিন ছিল যা পিক্সিসন যন্ত্র দ্বারা পরিচালিত এবং ছোট লিভারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। ড্রামার তৈরি করা যেতে পারে যা বিভিন্ন রিদম প্যাটার্নকে বিভিন্ন খুঁটি দ্বারা চালানো যেতে পারে।

 

রেনেসাঁ কালীন ইতালিতে, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪২৫-১৫১৯) ১৪৯৫ সালের কাছাকাছি একটি হিউম্যনোয়েড রোবটের পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে আবিষ্কৃত দ্য ভিঞ্চির নোটবুকগুলি ছিল একটি যান্ত্রিক নাইটের বিস্তারিত অঙ্কন যা এখন লিওনার্দোর রোবট হিসাবে পরিচিত, সেগুলি বসতে সক্ষম এবং তাদের মাথা এবং চোয়াল নাড়াতে পাড়ে। নকশাটি শারীরিক গবেষণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা ছিল তার Vitruvian ম্যান রেকর্ড নামে পরিচিত, তিনি এটি নির্মাণ করতে চেষ্টা করেছিলেন কিনা তা জানা যায় না।

 

জাপানে সপ্তম শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতকের দিকে কারাকুরি জুই (ইলাস্ট্রেটেড যন্ত্রপাতি, ১৭৯৬) একটি জটিল প্রাণী এবং মানব অটোমাটা তৈরি করেছিলেন। ঐটা ছিল অটোম্যাটন কারাকুরি নিংগ্যু নামে একটি যান্ত্রিক পুতুল। বিভিন্ন বৈচিত্র্য কারাকুরির বিদ্যমান: যেমন, থিয়েটারে ব্যবহার করা হয় বুতাই কারাকুরি, ছোট ছোট জাশিকি কারাকুরি ঘরে ব্যবহৃত হয় এবং দাশি কারাকুরি ধর্মীয় উৎসবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে পুতুলদের ঐতিহ্যগত এবং পৌরাণিক কাহিনী পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

 

 

ফ্রান্সে, ১৭৩৮ থেকে ১৭৩৯ সালের দিকে জ্যাকস দে ভকানসন বেশ কিছু জীবন-মাপের অটোম্যাটন প্রদর্শন করেছিলেন। উদারণসবরূপ, একটি বাঁশি বাদক, একটি পাইপ বাদক এবং একটি হাঁস এর কথা বলা যায়। যান্ত্রিক হাঁসটি তার ডানা ঝাঁপটাতে পারে, তার ঘাড় নাড়াতে পারে, এবং প্রদর্শনকারীর হাত থেকে খাবারটি গ্রহণ করতে পারে, এবং এটি দেহের একটি গোপন স্থানে সংরক্ষিত বস্তুটি বহন করতে পারে।

 

প্রাচীন চীনে, লি জি এর ৩য় শতাব্দীর পাঠে হিউম্যানোয়েড অটোম্যাটর একটি বিবরণ পাওয়া যায় যার মধ্যে চীনের সম্রাট মুংহের ঝৌ এবং এর সাথে একজন যান্ত্রিক প্রকৌশলীকে 'কারিগর' নামেও পরিচিত করা হয়েছিল। ইয়েন শি গর্বের সঙ্গে রাজাকে মানুষের আকারে উপস্থাপন করেছিলেন যেখানে তিনি হস্তনির্মিত কাঠ, চামড়া এবং কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করেছিলেন। হান ফেই জি এবং অন্যান্য গ্রন্থে উড়ন্ত অটোমাটারের অ্যাকাউন্টও রয়েছে যা পঞ্চম খ্রিস্টপূর্বাব্দের মহিস্টের দার্শনিক মোজী এবং তার সমসাময়িক লু বানের কৃত্রিম কাঠের পাখি (ম্য ইউয়ান) যা সফলভাবে উড়ে যেতে পারে তার প্রমাণ রয়েছে ঐখানে। ১০৬৬ সালে, চীনা আবিষ্কর্তা সু সং একটি জলঘড়ি তৈরি করেছিলেন যা একটি টাওয়ারের আকৃতির ছিল। যার মধ্যে যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল যা সময় নির্দেশ করত।

 

রোবটিক্সের ব্যবহারবিধিঃ-

*শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত রোবট 

 

শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত রোবটগুলি রোবট সাধারণত একটি সংযুক্ত হাত দিয়ে গঠিত (মাল্টি লিঙ্কযুক্ত manipulator) এবং তার মধ্যে একটি স্থায়ী পৃষ্ঠ সংযুক্ত করা থাকে। সবচেয়ে সাধারণ প্রকারের একটি প্রযোজক হল gripper assembly।

 

*পরিষেবা রোবট

 

শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রোবটগুলি রবোটিক হাত এবং ম্যানিপুলার দিয়ে গঠিত যা মূলত উৎপাদন ও বণ্টনের জন্য ব্যবহার করা হয়। "পরিসেবা রোবট" শব্দটি সুনির্দিষ্ট নয়। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিক্স একটি পরীক্ষামূলক সংজ্ঞা প্রস্তাব করেছে, "একটি পরিসেবা রোবট হল একটি রোবট যা আধা বা সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে যা মানুষের এবং সরঞ্জামের সুবিধার জন্য উপযোগী করে তৈরি তবে তারা উৎপাদন কর্মকাণ্ডের আওতাবহির্ভূত।"

 

*সামরিক রোবট

 

সামরিক রোবটগুলির মধ্যে রয়েছে SWORDS রোবট যা বর্তমানে স্থল-ভিত যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। এটি বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিগু লির নিয়ন্ত্রণের কিছুটা স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়েছে।

 

*স্বাস্থ্যসেবা

 

স্বাস্থ্যসেবাতে রোবটগুলির দুটি প্রধান ফাংশন রয়েছে। যা Multiple Sclerosis রোগে ভুক্তভোগীকে সাহায্য করতে পারে, এবং ফার্মাসি এবং হাসপাতালের সামগ্রিক সিস্টেমে সাহায্য করতে পারে।

 

*গবেষণা রোবট

 

এটি প্রাণীদের উপর ভিত্তি করে রোবট ডিজাইন করার একটি পদ্ধতি। বায়োনিক ক্যাঙ্গারু ডিজাইন করা হয়েছিল একটি ক্যাঙ্গারুর চলাফেরার পদ্ধতির অধ্যয়ন এবং প্রয়োগ করার মাধ্যমে।

 

*সেক্স রোবট

 

Humanoid যৌন রোবট এর ধারণা পাবলিক মনোযোগ এবং উদ্বেগ দুটিই আকর্ষণ করেছে। ধারণাটির বিরোধীরা বলেছে যে যৌন রোবটগুলির উন্নয়ন নৈতিকভাবে ভুল হবে। তারা যুক্তি দেয় যে, এই ধরনের ডিভাইসগুলির প্রবর্তন সামাজিকভাবে ক্ষতিকর হবে, এবং নারী ও শিশুদের উপর বিরূপ প্রভাব পরবে।

 

 

কেমন হবে আগামীর পৃথিবী!

 

 

আজকাল রোবট বেশ আলোচনা আর আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। কিছুদিন আগেও বেশ আলোচনামুখর একটা বিষয়বস্তু ছিলো হিউম্যান রোবট সোফিয়া। রাজধানী ঢাকার গুলশানে কোনো একটা রেস্টুরেন্ট এ লাইন ফলোয়ার রোবট নাকি যাবতীয় কাজ করছে। খাবার পরিবেশন করছে। রোবট নিয়ে আরো কি সব মজার মজার অদ্ভুত অদ্ভুত সব গবেষণা চলছে শুনলাম।

তো আসুন আপনাদের ও শুনাই সেই সব। World Economic Forum এর জরিপ অনুযায়ী আগামী রোবট ইতোমধ্যে Blue Collar Industry  তে কাজ করা শুরু করেছে। খুব দ্রুত তারা White Collar Industry তে ও কাজ শুরু করবে। ধারণা করা যায় যে, আনুমানিক ২০২১ সালের মধ্যে রোবট ফার্মাসিস্ট হিসেবে ও কাজ করবে। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করি বলি।

একজন ফার্মাসিস্ট এর ৫/৬ বছরের ট্রেনিং/কাজের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তিনি এটা নিশ্চিত করেন যে আপনি সঠিক ঔষধ সঠিক মাত্রায় পাচ্ছেন কি না! কিন্তু এখন গবেষকরা ধারণা করছেন যে, একজন মানু্ষের যে কাজ করতে চার/পাঁচ বছরের জ্ঞান খাটাতে হয়, একটা রোবট নিমিষেই সে কাজ করে দিতে পারে। Houston Medical Centre এর একটা মেডিকেল স্টাডি তে দেখা যায় যে, তাদের ফার্মাসিস্ট প্রতি ১০ হাজার প্রেস্ক্রিপশনে ৫ টা ভুল করে থাকেন। হ্যা এটা কথা সত্য যে, একজন মানুষের জন্য ১০ হাজারে ৫ টা ভুল আহামরি কিছু নয়। কিন্তু এটা অন্য একজন মানুষের জীবনের প্রশ্ন। তাই এইটুকু ঝুঁকিও বা আমরা কেন নিবো যেখানে গবেষণা অনুযায়ী রোবট প্রায় বিনা ভুলে সঠিক চিকিৎসা দিতে সক্ষম হচ্ছে। 

এইতো গেলো ফার্মাসিস্ট রোবটের কথা। এবার তবে একটা চমকপ্রদ খবর দেই।

Ingestible Robot, এটা এমন একধরনের রোবট যা কি না মানুষের খাদ্যনালী এবং পেটের ভিতর ঘুরে বেড়াতে পারে। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। এরকম একটা রোবটই আসতে চলেছে ২০২৪ সালের দিকে।  ১৯৬৬ সালে Fantastic Voyge নামের একটা মুভিতে এমন একটা জগত কে দেখানো হয়েছিলো যেখানে মানুষকে একদম মাইক্রোস্কোপিক আকারের করে দেয়া হতো এবং তাদের কাজ ছিলো অসুস্থ মানুষদের ভিতরে প্রবেশ করে তাদের রোগমুক্ত কর। প্রায় ৫০ বছর পর সেই কনসেপ্ট কে বাস্তবায়ন করে MIT 'র  CSAIL (Computer Science & Artificial Intelligence Laboratory)  তে এই Ingestible Origami Robot নিয়ে কাজ করে একদল গবেষক। ১৯৮৫ সালে রোবট দিয়ে Stereotatic brain biopsy করা হয়। ঠিক তার পরের বছরই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিতম্ব প্রতিস্থাপন, এন্ডোস্কপি এবং অন্যান্য কিছু ছোটখাটো রোগের চিকিৎসা করা হয়।

২০১৬ সালের শেষের দিকে  প্রফেসর ডেনিয়েল রুস এবং তার দল মিলে এমন একটা Ingestible Robot ডিজাইন করেন যা কি না চৌম্বকক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে মানব শরীরের অভ্যন্তরে গিয়ে নানা রকম রোগের চিকিৎসা করতে পারবে। ধারণ করা হয় যে, আনুমানিক ২০২৪ সালের দিকেই চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই ধরণের রোবটের ব্যবহার শুরু হবে। আচ্ছা, এতক্ষনে আপনার নিশ্চই খুব জানতে ইচ্ছা করছে যে, এমন একটা রোবট ঠিক কি দিয়ে তৈরী হতে পারে? খুব অবাক করা হলেও সত্যি যে এটা শুকরের শুকনো অন্ত্র আর চুম্বক দিয়ে তৈরী। 

দুই সেন্টিমিটার লম্বা এই রোবটটি অনায়াসেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অভ্যন্তরীণ ঘা, নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় ঔষধ প্রয়োগের কাজ করতে পারবে।

 

রোবটের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী দাঁড়াবে?

 

বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে ধরে নেওয়া যায়, যে নানা ধরনের রোবটের বাজার আগামী ১০ বছরে সম্ভবত তিন গুণ বেড়ে যাবে৷ এর অর্থ, ভবিষ্যতে প্রায়ই আমাদের সঙ্গে রোবটের দেখাসাক্ষাৎ হবে৷ এমন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের মনে ভয়ভীতি হবে, নাকি আমরা সহজেই তা মেনে নেবো? দেশ অনুযায়ী সম্ভবত এই মনোভাব নির্ভর করে৷

 

মানুষ কতটা খুশিমনে অথবা বিরক্তির সঙ্গে রোবটের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদান করে, তাৎসিয়া নোমুরা সেই বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন৷ একটি গবেষণার আওতায় তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ৭টি দেশের মানুষের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখেছিলেন৷ ব্রিটেন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো, চীন, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই গবেষণা চালানো হয়৷

 

তাতে জানা গেল, যে অ্যামেরিকার মানুষ রোবটদের বিষয়ে সবচেয়ে অনুকূল প্রতিক্রিয়া দেখান৷ তার পরেই জাপান, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, চীন ও ব্রিটেনের স্থান৷ কিন্তু মেক্সিকোর মানুষ এ বিষয়ে অত্যন্ত নেতিবাতক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন৷ প্রো. নোমুরা বলেন, ‘‘মানুষ রোবটকে ভালো না মন্দ মনে করেন, সেটি শুধু দেশের উপর নির্ভর করছে না৷ এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যেও ফারাক দেখা যায়৷ জাপানে সব প্রজন্মই রোবট পছন্দ করে৷ আবার ব্রিটেনে শুধু তরুণ প্রজন্মের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক৷ বয়স্করা এটি পছন্দ করেন না৷ সম্ভবত নারী ও পুরুষের মধ্যেও ফারাক থাকতে পারে৷'

কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় রোবট সম্পর্কে অনেক বেশি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন৷

 

জাপানের মানুষ মূলত হিউম্যানয়েড রোবট বেশি পছন্দ করেন৷ এমনকি তাদের মধ্যে মানুষের বৈশিষ্ট্যও রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন৷ প্রো. নোমুরা এই মনোভাবের ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘‘জাপানে অ্যানিমিজম বা সর্বপ্রাণবাদ নামের একটি ধারণা চালু রয়েছে৷ কোনো বস্তুর মানুষের আকার থাকলেই তার মধ্যে আত্মাও রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়৷ সুধু জাপান নয়, সব সংস্কৃতিতেই অ্যানিমিজমের রকমফের রয়েছে৷''

 

সংবাদমাধ্যম ও পপ সংস্কৃতি রোবটের ভাবমূর্তি গড়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই ভূমিকা রাখে৷ জাপানের চলচ্চিত্র ও মাংগা কমিকসে রোবটদের মধ্যে মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়৷ যেমন অ্যাস্ট্রো বয় নামের ক্লাসিক চরিত্র৷ অথবা ‘গোস্ট ইন দ্য শেল' কাহিনির মাংগা সংস্করণে৷

 

হলিউডে ‘আইরোবট'-এর মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রেরোবটরাই আধিপত্যবিস্তার করে মানবজাতির বিনাশের চেষ্টা করে৷

 

রোবট কি মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে?

 

দিনদিন তার ব্যবহার বাড়ছেই। সিঙ্গাপুরের বেশিরভাগ হোটেলেই ব্যবহার হচ্ছে রোবট। অবিকল মানুষ। এমনকি অন্য কাজেও রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে সে দেশে এবং তা ক্রমান্বয়েই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই অবস্থা জাপানেও। সেখানে সিঙ্গেল নর-নারীর সংখ্যা ৬০ শতাংশেরও বেশি। আবার তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশই কুমারী। সম্প্রতি স্থানীয় জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা গেছে জাপানের ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ৭০ শতাংশ অবিবাহিত পুরুষ এবং ৬০ শতাংশ অবিবাহিত নারীর জীবনে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে ৪২ শতাংশ পুরুষ ও ৪৪.২ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা এখনও কুমার অথবা কুমারী। অর্থাৎ তাদের যৌনমিলন বা সেক্সের কোন অভিজ্ঞতাই নেই। ফলে জনসংখ্যা সংকটে যেন হিমসিম খাচ্ছে জাপান। একদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে জন্মহার।

স্মরণীয় যে, এ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, জাপানীদের বেশিরভাগেরই কর্ম হচ্ছে- শুধু জ্ঞানার্জন, না হয় কাজ। এভাবে চলতে চলতে তাদের মধ্যে একাকিত্বভাব সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, কর্ম শেষে গৃহে গেলে- শুধু একা। বাবা নেই, মা নেই, ভাই নেই, বোন নেই। কারণ, আমাদের মতো তাদের জয়েন্ট ফ্যামিলী নয়। সবাই ইনডিভিজুয়াল লাইফ হোল্ড করে। দ্বিতীয়ত তাদের বেশিরভাগই হিপ্পি। যা আমাদের ভাষায় বলে পিতা-মাতার পরিচয়হীন। তাই সঙ্গিহীন অবস্থায় তারা একাকিত্ব ফিল করে গৃহে ফিরলেই। ফলে ডিপ্রেশন সৃষ্টি হচ্ছে তাদের মধ্যে। এই অবস্থা থেকে তাদেরকে রক্ষা করে প্রাণচঞ্চল্যময়ী করার জন্য চালু করা  হয়েছে নারী রোবটের ব্যবহার। এটার পথ নির্দেশক মনোবিজ্ঞানীরা। তাদের পরামর্শেই চালু করা হয়েছে এটা। অবিকল নারী। তাও অপরূপ সুন্দরী। দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। কথা-বার্তা ও অঙ্গভঙ্গি খুবই আকষর্ণীয়। কথা বলছে, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। নির্দেশ মোতাবেক সব কর্মও করছে অর্থাৎ একজন মানুষ যা করতে পারে, তার প্রায় সবই করছে। এতেই মহা খুশি নিঃসঙ্গ জাপানীরা। যা হোক, রোবট হোক, আর মানুষ হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। কথা বলার ও নানা কাজে সাহায্য করার একজন পেয়েই প্রাণচাঞ্চল্যময় হয়ে উঠছে জাপানীদের জীবন।

যা হোক, রোবট সংক্রান্ত আরো খবর আছে। যেমন- রোবট সাংবাদিকতা করছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করছে, ছবি তুলছে। অর্থাৎ আমরা সাংবাদিকরা যা করি, তার প্রায় সবই করছে রোবট। এটা শুরু হয়েছে চীনে। চীনে অনেকদিন আগেই শুরু হয়েছে রোবটের ব্যবহার। এটা শিল্প, কল-কারখানা ও অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এখন শুরু হয়েছে সাংবাদিকতায়। এ ব্যাপারে প্রকাশ, চীনের একটি সংবাদপত্রে গত ১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হলো রোবট সাংবাদিকের লেখা প্রথম প্রতিবেদন। মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ৩০০ শব্দের প্রতিবেদন লিখে ফেলেছে জিয়াও ন্যান নামের এই রোবট। চীনের গুয়াংঝৌ প্রদেশের সাউদার্ন মেট্রোপলিস ডেইলি নামে একটি সংবাদপত্রে ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ানজিয়াওজুন এই রোবট সাংবাদিক প্রকল্পের প্রধান। তিনি বলেন, ‘সাধারণ সাংবাদিকদের তুলনায় জিয়াও ন্যানের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা অনেক বেশি। সে দ্রুত গতিতে খবর লিখতেও পারে। রোবট সাংবাদিকের লেখা প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চীনে সাংবাদিকদের মধ্যে কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে’।

উল্লেখ্য, রোবট ছাড়া চীনের উপায়ও নেই। কারণ, ১৫০ কোটির অধিক লোক। তবুও কাজ অনুযায়ী লোক নেই। তাই নিম্ন কর্ম বন্ধ করে দিচ্ছে তারা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-গার্মেন্টস। এতে অবশ্য আমাদের ভাগ্য প্রসন্ন হচ্ছে। কারণ, গার্মেন্ট রফতানিতে চীন প্রথম, মোট রফতানির ৪১শতাংশই তারা করে। আমরা দ্বিতীয়, মোট রফতানীর ৬.৪ শতাংশ আছে আমাদের দখলে। তাই চীন অর্ডার ফেরৎ দিলে সেটা আমাদের দেশে আসার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, এখানে শ্রমিকের মজুরি কম। অবশ্য আমাদের অবস্থান দখল করার জন্য ভারত ও ভিয়েতনাম উঠে পড়ে লেগেছে। জানি না ভবিষ্যৎ কী? তবে ইতোমধ্যেই ভিয়েতনামের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প- টিপিপি বাতিল করে। এই টিপিপি’র আওতায় ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ শতাংশ শুল্ক ছাড়ে গার্মেন্ট পণ্য রফতানি করতে পারতো। আর আমাদের ১৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। ফলে প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারতাম না। এখন টিপিপি বাতিল হওয়ায় আমরা রক্ষা পেয়েছি। স্মরণীয় যে, চীন সাংবাদিকতায় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে রোবট ব্যবহার করছে কর্মক্ষম লোকের স্বল্পতার কারণে। দীর্ঘদিন যাবত এক সন্তাননীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করায় চীনে শিশু-কিশোরের সংখ্যা হ্রাস আর বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কাজের মানুষের স্বল্পতা সৃষ্টি হয়েছে। এটা দূর করার জন্য দুই সন্তান নীতি গ্রহণ করেছে এক বছর আগে। আর এই সময়েই প্রায় দুই কোটি শিশু অতিরিক্ত জন্ম নিয়েছে।

যাহোক, আগামীতে যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হবে রোবট। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমনই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেনাছাউনিতে জিনিসপত্র পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হবে রোবট। যেসব সেনাছাউনিতে জিনিসপত্র পৌঁছাতে অসুবিধা হয় অথচ শত্রুপক্ষের হাত থেকে বাঁচতে একচুলও নড়তে পারে না সেনা সদস্যরা,  রোবটই সেখানে পৌঁছে দেবে রেশন বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। দেশটির সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়েছে, এই মেশিন-মানবেরা ৫০ কেজি পর্যন্ত ওজনের জিনিস বহন করতে পারবে। ৫০ ডিগ্রি  সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও দৌড়াবে সেই রোবট। ২১ হাজার ফুট উচ্চতায় এদের ব্যবহার করা যাবে সহজেই। বরফে মোড়া রাস্তাতেও তাদের কোন অসুবিধা হবে না। এই রোবট ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যুক্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীর অনেক উপকার হবে। কারণ, দেশটির সীমান্তে সিয়াচেনসহ একাধিক জায়গায় প্রবল উচ্চতায় মোতায়েন রয়েছে সেনাবাহিনী। সেইসব সেনাঘাঁটি এতটাই  উঁচুতে যে কোন গাড়ি সেখানে পৌঁছতে পারে না। সিয়াচেন বিশ্বের উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্র। আগামী ৩ বছরের মধ্যেই এই প্রজেক্ট শেষ করার ডেডলাইন দেয়া হয়েছে।

 

পশ্চিমের দেশগুলোর সেনাবাহিনী থেকেই এসেছে এই পরিকল্পনা

উল্লেখ্য, ভারত সামরিক বাহিনীতে রোবট ব্যবহার করলে তার চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এবং চীনও বসে থাকবে না। তারাও সামরিক বাহিনীতে রোবট ব্যবহার করবে। তদ্রুপ অন্য শক্তিশালী দেশগুলোও। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে যথাশিগগিরই। এর আগে যুদ্ধক্ষেত্রে চালু করা হয়েছে মনুষ্যহীন ড্রোন। দক্ষ বৈমানিকের মতোই নির্দিষ্ট স্থানে আঘাত হেনে নির্বিঘেœ ফিরে আসছে ঘাঁটিতে। এখন পণ্য সরবরাহেও ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোতে। এরপর অন্য দেশেও চালু হবে? স্মরণীয় যে, চীন, সিঙ্গাপুর ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোতেও জন্মহার খুব কম।

তবে চীনের মতো এক সন্তান নীতির কারণে নয়- অতিরিক্ত পরিশ্রম করার কারণে। অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে কাম-ভাব ও জন্মহার হ্রাস পায়। এটা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত। আর সে জন্যই সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান এবং ইউরোপের দেশগুলোতে জন্মহার বৃদ্ধি প্রায় শূন্য। অতিরিক্ত চিন্তাশীল লোকের মধ্যেও কামভাব সৃষ্টি হয় কম। তাই জন্মহারও কম। ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে ক্রমান্বয়েই। তাই এসব দেশগুলোতে রোবট ও প্রযুক্তির ব্যবহার দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত রোবট ও প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যয়ও কমে আসছে। একবার ক্রয় করলেই ব্যয় শেষ। কোন বেতন-ভাতা, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান ইত্যাদির প্রয়োজন নেই। ফলে রোবট তৈরি পণ্য উৎপাদন ও অন্যান্য কর্মের ব্যয় কম পড়ে। আর মানুষসৃষ্ট কর্মের ক্ষেত্রে উৎপাদন কস্ট বেশি। কারণ, মানুষের বেতন-ভাতা, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি ব্যয় আছে। তাই মার্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থেই অধিক জনসংখ্যার ও বেকারের দেশগুলোকেও বাধ্য হয়েই বিভিন্ন কর্মে রোবট ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতেই হবে। আর রোবট ব্যবহার যতো বেশি হবে কর্মে মানুষের প্রয়োজনীয়তা তত হ্রাস পাবে। তাই রোবট মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।

এক পর্যায়ে গিয়ে তথা দুই তিন দশকের মধ্যেই প্রায় সব কর্মেই রোবট ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হতে পারে। ফলে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে আশঙ্কাজনকভাবে! এ ব্যাপারে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিচালক কার্ল ফ্রেই এর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে বিপদে পড়বে মধ্যম আয়ের মানুষ। ক্রমাগত তারা চাকরি হারাবে। তাদের স্থান দখল করবে রোবট। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন গোয়েন্দা, বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটরা। এর ফলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে রোবটের কারণে চাকরি হারাবেন কমপক্ষে আড়াই লাখ মানুষ। তিনি আরো বলেছেন, রোবটের আবির্ভাবের কারণে শুধু ব্রিটেনেই শতকরা ৩৫ ভাগ কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। এ বিষয়ে যারা ঝুঁকিতে থাকবে তাদের একটি তালিকাও প্রকাশ করেছেন। তাতে দেখা যায়- ইন্সুরেন্স ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কাজ শতকরা ৯৭ ভাগের বেশি চলে যাবে কম্পিউটারের দখলে। এর ফলে মধ্যম আয়ের মানুষগুলো পড়বেন বেশি ঝুঁকিতে। পোস্টাল সার্ভিসে চাকরি হারানোর ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ। ল্যাবরেটরির টেকনিশিয়ানের চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে ৮৯ শতাংশ। অ্যাকাউনটেন্ট অডিটর পদের ঝুঁকি রয়েছে ৯৩ শতাংশ। এ সবই ঘটতে পারে উন্নতমানের সুপারসিড রোবট মানবের কারণে।

 

 

রোবট ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়লে তাদের অবস্থা কী হবে তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে বিপদ অবধারিত। এই অবস্থায় আমাদের বিপদ আরো বেশি। কেননা, এখনই তিন কোটির অধিক লোক বেকার। তারা দুর্বিষহ জীনব-যাপন করছেন। সর্বোপরি প্রতিবছর নতুন করে ২২ লাখ নুতন লোক শ্রম বাজারে প্রবেশ করছেন। এটা আরও বাড়বে ক্রমান্বয়েই। কারণ আমাদের জন্মহার বেশি। কিন্তু সে তুলনায় কর্মসংস্থান হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে রোবট ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়লে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। তবুও ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ -এর মতো সাংবাদিকতার কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোবট ব্যবহার করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে আমাদের দেশে। অন্তত নিরাপত্তা বিঘিœত সংক্রান্ত ক্ষেত্রে। যেমন- মিছিল-মিটিং, সন্ত্রাসী ও স্বার্থান্বেষী মহলের খবর সংগ্রহের কর্মে। কারণ এসব কর্ম করতে গিয়ে প্রায়ই সাংবাদিকগণ ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি সরকারি বাহিনী-পুলিশের দ্বারাও। অর্থাৎ বিভিন্নভাবে এ পর্যন্ত বহু সাংবাদিক খুন-জখম হয়েছেন। সর্বশেষ নিহত হয়েছেন সাংবাদিক শিমুল। তিনি পাবনায় সরকারি দলের দু’পক্ষের মারামারির খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হয়েছেন। এর আগে সাগর-রুনিসহ বহুজন খুনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু বিচার হয়নি কোন ক্ষেত্রেই! উপরন্তু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার তো অন্ত নেই!

স্মরণীয় যে, অন্যদিকেও বিপদ বৃদ্ধি পাচ্ছে সাংবাদিকদের। সেটা হচ্ছে বেকারত্ব। এখনই বহু সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েছেন। ফেইসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যাম, ইন্টারনেট এবং অনলাইনভিত্তিক পত্রিকা/খবর পরিবেশন বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল ধারার মিডিয়াগুলোর চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে ক্রমশ। ফলে সাংবাদিকরা কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে।

 

এই অবস্থায় সাংবাদিকতার সাধারণ ক্ষেত্রগুলোতে রোবট ব্যবহার মড়ার উপর খাঁরার ঘা হয়েই দেখা দিবে! তবুও মানুষের নতুনের প্রতি আকর্ষণ বেশি। তাই রোধ করা দুরূহই।

 

রোবটিক্সের সুবিধা :

 

জিপিএস প্রযু্ক্তির সুবিধা :

 

রোবট দ্বারা মোবাইল ফোন অথবা গাড়িতে থাকা জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে আমাদের রাস্তার পাশের সাইনবোর্ডে আর রাস্তা চেনার প্রয়োজন পড়বে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা গাড়ি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।

 

খনিজ সম্পদ, পেট্রোল জ্বালানি অনুসন্ধান :

 

রোবটের  সহায়তায় এমন সব কাজ করা যাবে যা মানুষ দ্বারা করা সম্ভব হবে না। গভীর সমুদ্রের তলদেশে খনিজ পদার্থ, পেট্রোল ও জ্বালানির খোঁজ করা এবং খনি খননের কাজ খুবই কঠিন হয়ে থাকে। তাছাড়াও সমুদ্রের তলদেশে পানির প্রচণ্ড চাপ থাকে। এ জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্রের সহায়তায় সহজেই কাজগুলো করা যাবে।

 

খেলার প্রশিক্ষণ :

 

আজকাল রোবট দ্বারা ক্রিকেট, ফুলবল, বেসবল, দাবা ইত্যাদি খেলার ছবি তোলা হচ্ছে। এটি খেলার প্রশিক্ষণও দিতে পারছে।

 

চিকিৎসা ক্ষেত্র :

 

রোবট দ্বারা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অপারেশন, এক্সরে, রেডিও সার্জারি ইত্যাদি কাজ সফলতার সাথে করা যাচ্ছে।

 

অন্যান্য সুবিধা :

 

সাধারণত রোবট যন্ত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাবে। এগুলো ক্লান্ত হবে না। যেখানে মানুষ কিছুক্ষণ কাজ করার পর ক্লান্ত হয় সেখানেও এই যন্ত্র শতভাগ সফলতার সাথে কাজ করতে পারবে।

 

রোবটিক্সের অসুবিধা :

 

বেকারত্ব বৃদ্ধি :

 

রোবট ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে। ফ্যাক্টরি, ব্যাংক ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র ব্যবহৃত হলে হাজার হাজার লোক বেকার হয়ে পড়বে।

 

খরচ বৃদ্ধি :

 

রোবট যন্ত্রে খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। ব্যাংক, এটিএম বুথ, ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল ইত্যাদিতে এই যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য প্রচুর খরচ পড়বে। এছাড়াও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও অনেক বেশি হবে। আবার প্রোগ্রাম সফ্টওয়্যার বারবার পরিবর্তন করারও প্রয়োজন পড়তে পারে।

 

সৃজনশীলতা হ্রাস :

 

রোবট ফলে মানুষের সৃজনশীলতা হ্রাস পাবে। কারণ মানুষ তখন নিজে চিন্তা-ভাবনা না করে যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়বে।

 

বিপজ্জনক অস্ত্র নির্মাণ :

 

মনে করা হয় যখন এই যন্ত্রে নিজস্ব অনুভূতি প্রবেশ করানো হবে তখন নিজে নিজে বিপজ্জনক অস্ত্র নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। তখন সেই অস্ত্র দিয়ে মানবজাতিকে শাসন ও শোষণ করতে পারে। এছাড়াও তা হতে পারে মানবজাতির ধ্বংসেরও কারণ।

 

অভিজ্ঞতা অর্জন হ্রাস :

 

সাধারণত মানুষ কোনো কাজ করার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করে ও পরবর্তীতে আরও উন্নতভাবে কাজটি করতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র তা পারছে না। এটি তার ভেতরের সফটওয়্যারে যা প্রবেশ করানো আছে সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারে।

 

সঠিক ভুল বোঝে না :

 

রোবট যন্ত্রগুলোর ভিতরে থাকা প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করে। কাজটি সঠিক নাকি ভুল হল সে সম্পর্কে কোনো ধারণা করতে পারে না।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা ও অসুবিধা বিবেচনায় বিজ্ঞানের উচিত এই ব্যবস্থাকে মানবকল্যাণে কীভাবে ব্যবহার করা যায় সে সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা করা। এছাড়াও এই ব্যবস্থার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে সুষমভাবে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।

এম ইব্রাহিম 
টিমঃ অগ্নিবীণা
ক্যারিয়ার ক্লাব অফ আর্টস ফ্যাকাল্টি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 
এই বিভাগের আরও