বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ||✍:সিরাজুম মনিরা || ক্যারিয়ার ক্লাব অব আর্টস ফ্যাকাল্টি (ক্যাফ)||

এস এইচ/এস ই

১৭-১০-২০২০

This image is not found

Nanannamamammamammamsm

 

ব্যক্তি বিশেষে জেনে শুনে ভুল করলে তাকে বলা হয় 'জ্ঞানপাপী'। কিন্তু গোটা মানবজাতি বছরের পর বছর ধরে সতর্কবাণী উপেক্ষা করে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চললে কি হয় তার সংজ্ঞা এখনো তৈরি হয়নি। এরকম একটি আলোচ্য বিষয় হল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। এটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বিশেষ ঘটনা। সাধারণত সময় বা কারণ নিরপেক্ষ হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলতে ইদানিংকালের উষ্ণতা বৃদ্ধি কে নির্দেশ করে।

সৌর রশ্মি তরঙ্গ রূপে বায়ুমণ্ডল ভেদ করে এসে ভূপৃষ্ঠে পড়ে এবং এরপর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত সূর্য রশ্মি দীর্ঘ তরঙ্গ রূপে মহাশূন্যে ফিরে যায়।  কিন্তু মানুষের অবিবেচনা প্রসূত ক্রিয়া-কলাপ এর ফলে ট্রপোস্ফিয়ারের গ্রীন হাউজ গ্যাস (কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ,নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি) এর পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে রশ্মি দীর্ঘ তরঙ্গ মহাশূন্যে ফেরত যাবার সময় এই গ্রিন হাউস গ্যাস গুলি দ্বারা শোষিত হয় এবং তাদের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। এই ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার জন্য ওজন স্তরের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বিকিরণ কত চাপ প্রয়োগ করে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এলাকায় যে উষ্ণায়নের সৃষ্টি করে ,সেই একই প্রক্রিয়ায় স্ট্রাটোমন্ডলকে শীতল করে। আর এই শীতলায়নে ওজন স্তরের ক্ষয় ও ওজন স্তরে ফুটোর  সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ফলে পৃথিবীর দীর্ঘ  তরঙ্গদর্ঘ্য বিশিষ্ট সূর্য রশ্মি প্রবেশ করে যাতে পৃথিবীর তাপমাত্রা স্বাভাবিক অপেক্ষা বৃদ্ধি পেতে থাকে যাকে বৈজ্ঞানিকরা বলেন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা (Global Warming) বিগত ১০০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস   (Smith,2005) ।

 Instrumental Temperature Record অনুযায়ী ১৮৬০ সাল থেকে ১৯০০ সালের তুলনায় ভূভাগ ও সমুদ্র  উভয় ক্ষেত্রেই তাপমাত্রা 0.৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৯ সাল থেকে ভূভাগের  তাপমাত্রা মহাসাগরের তাপমাত্রার চেয়েও দ্বিগুন দ্রুততায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহকৃত  তাপমাত্রা পরিমাপ হতে দেখা যায়, নিম্ন ট্রপোমণ্ডলের তাপমাত্রা ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতি দশকে ০.১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ০.২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমার মধ্যে  বৃদ্ধি পেয়েছে। NASA এর Goddand Institute for Space Studies এর করা হিসাব অনুযায়ী ২০০৫ সাল ছিল সবচেয়ে উষ্ণ বছর যা ইতিপূর্বে লিপিবদ্ধ উষ্ণতম ১৯৯৮ সাল থেকে ১ ড্রিগ্রি সেলসিয়াস এর কিছু বেশি উষ্ণ।

 

সমস্যা কোথায়?

 

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বেশি দায়ী  মনে করছেন গ্রীন হাউজ গ্যাস কে। তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প  কারখানা, গৃহস্থালির কাজে কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের দহনের ফলে প্রচুর পরিমাণে CO2,CO,SO2,CH4,N2O যুক্ত হয়।যা  পার্থিব বিকিরণে  বাধা দিয়ে তাপ শোষণ করে বায়ুমন্ডলের ভয়ঙ্করভাবে উত্তপ্ত করে তুলেছে। এসব গ্রীন হাউজ গ্যাস যেমন পৃথিবীর বায়ুকে দূষিত করেছে তেমনভাবে দূষিত করেছে বায়ুমন্ডলকে।

নগরায়ন ও শিল্পায়ন এর ফলে এসি, ফ্রিজ ,জেনারেটর এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণ CO2,৷ CH, N2O, CFC নির্গত হয়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের পাল্লা ভারী করেছে। 

IPC এর একটি সমীক্ষা মতে,গ্রীন হাউজ গ্যাস ভূমিকা :

 

1

কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2)

৪৯ %

 

2

মিথেন(CH4)

১৮ %

 

3

ক্লোরোফ্লোরো কার্বন(CFC)

১৪ %

 

4

নাইট্রাস অক্সাইড

৬ %

 

5

অন্যান্য গ্যাস

১৩ %

 

মোট

১০০ %

 

 

যেখানে এক লিটার পেট্রোল দহনে প্রায় ২.১৭ কেজি কার্বনডাই-অক্সাইড  তৈরি হয় এবং কোন যানবাহন ৬ কিলোমিটার চললে প্রায় ১ কেজি কার্বনডাই-অক্সাইড  নিঃসরণ করে যেখানে প্রতিদিন বায়ুমন্ডলে কি পরিমান কার্বনডাই-অক্সাইড  সহ অন্যান্য গ্যাস জমা হয় তা ভাবলেও আঁতকে উঠতে হয়।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো তাদের আরও উন্নত এবং ক্ষমতা প্রদর্শন এবং নিজেদের জাহির করার লক্ষ্যে পারমাণবিক চুল্লী এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। যার ফলে গ্রীন হাউস গ্যাস সহ বিষাক্ত গ্যাস বায়ুমন্ডলে মিশছে। যার ফল ভোগ করছে পুরো পৃথিবী।এইসব কম্পানির কার্বন নিঃসরণের বিধি নিষেধ থাকলেও তারা সেটির তোয়াক্কা না করে পরিবেশকে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে ফেলছে। 

মানুষ নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করে যেমন ক্ষতিকারক গ্যাস গুলি কে বায়ুমন্ডলে মেশার সুযোগ করে দিচ্ছে একই সাথে কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা এই মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত উল্কাপাত দাবানল এর সময় প্রাকৃতিকভাবে নির্গত এস সি ও এইচ এস সি এল ধুলা  ও জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করেছে। 

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মার্ক ফ্লিভার্ড ও  জার্মান বিজ্ঞানী সামি সোলঙ্কী এর মতে , আগামী কয়েক বছরের সৌর বিকিরণ ও সৌর কলঙ্কের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়ে চরম সীমায় পৌঁছাবে  যা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করবে।

 

 কি প্রভাব পড়েছে?

 

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মৌসুমী বায়ু এবং শীত ও গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রা বেশ খানিকটা হেরফের ঘটেছে।যার দরুন অ্যান্টার্কটিক এর হিমবাহের গলন দ্রুত হচ্ছে। বরফ গলে হাজার হাজার টন পানি প্রতি মিনিটে মহাসাগর গুলোতে মিশে যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াচ্ছে এবং প্লাবিত করছে ভূ-ভাগ। 

 গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রভাবে ওজন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার ফলে অধিক অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে পড়ছে। অতিবেগুনি রশ্মির তেজস্ক্রিয়তা ই সম্ভবত সামুদ্রিক প্রবাল এর মৃত্যুর জন্য দায়ী যা সমুদ্র গভীরে ডুবন্ত কার্বনডাই-অক্সাইড  এর মত কাজ করে। ইতিমধ্যেই গ্রেট ব্যারিয়ার রিপে ২০ শতাংশ প্রবাল নষ্ট হয়ে গেছে। 

বিগত কয়েক দশকে সমুদ্রের পানি ও উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ আমেরিকা, পেরু, চিলি উপকূলের অদূরে দক্ষিণ পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ স্রোত এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার দরুন বিশ্ব জলবায়ু দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছে। 

 

অতিবৃষ্টি,অনাবৃষ্টি, তুষারপাত, বন্যা ,খরা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির দরুন প্রকৃতির সাথে মানুষ অন্যান্য প্রাণী এবং গাছপালা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে বেশ কিছু প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে আরও প্রায় ১৪ হাজার প্রজাতির বিলুপ্তির পথে। মেরু এলাকায় মেরু ভাল্লুকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক ভাবে কমে গেছে।সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির প্রানি এবং প্রবালের অস্তিত্ব এখন আর খুঁজেই পাওয়া যায় না।শুধু যে জলেই এমনটি ঘটেছে তা না।পৃথিবীর ভূ ভাগ থেকেও অনেক প্রজাতির প্রাণী এবংগাছপালা হারিয়ে গেছে চিরতরে।মানুষের ভুলেই খরা ,বন্যা মহামারীতে যেমন মানুষ জরাগ্রস্ত তেমনি  হাঁফিয়ে উঠেছে। 

 

 

 কি বলেছে আইপিসিসি সহ বিভিন্ন সংস্থা?

 

একশটি দেশ ও একশ জন বিজ্ঞানীর নিয়ে গঠিত আইপিসিসি ২০১৪ সালে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন 

১. বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য ৯০% মানুষ দায়ী। 

২.২১০০ সালের নাগাদ পৃথিবীর উষ্ণতা ৩.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধির আশঙ্কা আছে। 

৩.গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন বন্ধ না করলে পৃথিবীর চরম ক্ষতি অনিবার্য।

 আইপিসিসি আরো বলেন, আমাদের গ্রহটি ১২ বছরের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির চূড়ান্ত সীমায়  ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে যেটা কিনা প্রাক শিল্প যুগের মাত্রার চেয়েও বেশি। এতে করে আবহাওয়া পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রূপ নেবে। বিশেষ করে দুর্ভিক্ষ,দাবানল ,সেইসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ খাদ্যসংকটের  ঝুঁকি বাড়িয়ে দিবে।

এছাড়াও এ বিষয়ে ১৯৭৯ সালে জেনেভা ,১৯৮৮ সালে টরেন্টো , ২০০২ সালে জোহানেসবার্গ, ২০০৭ সালে বালি , ২০০৯ সালে সেন্টপিটার্সবার্গ ও ২০১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ এবং এর থেকে কিভাবে পরিত্রান পাওয়া যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।

জীবাশ্ম ভিত্তিক জ্বালানি ছেড়ে বিকল্প জ্বালানি অথবা কম নির্গমন হয় এমন কিছু ব্যবহার করে জ্বালানির ব্যবহার ০.০৬ শতাংশ কমিয়ে আনা। এতে করে বছরে ৩০০০কোটি ডলার কমে আসবে বলে আশঙ্কা করেছে আইপিসিসি। কার্বন নিঃস্বরণের হার লক্ষ্যে কার্বন বাণিজ্য নামক এক কৌশলের ও অবতারণা করা হয়। 

এছাড়াও আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা আছে। যেমন: নবায়নযোগ্য শক্তি (সৌর, বায়ু, জোয়ার-ভাটা,সমুদ্রস্রোত, ভূ-তাপ) ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি করা। পরিবহন গুলোতে ইউরো  প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইঞ্জিন করা এবং ইঞ্জিন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ব্যক্তিগত যান ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার বৃদ্ধি করা। 

প্লাস্টিক রং এবং রেফ্রিজারেটর শিল্পে CFC, ১১, ১২ এবং হ্যালোজেন ১২১১ ,১৩০১ব্যবহার বন্ধ করে HCFC, HFC, HC, HBFC ব্যবহার করা। গাছের সংরক্ষণ চোরাচালানি এবং বৃক্ষরোপণ সম্পর্কিত সবরকম আইন কানুন কঠোরভাবে পালন করা। 

পরিশেষে, আইপিসিসি এর প্রধান রাজেন্দ্র পচৌরি বলেন, "বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মোকাবেলা করতে যত দেরি হবে,তার ব্যায়ভার ও ততই  বেড়ে যাবে।" 

মানুষের অজ্ঞতা, মুনাফালোভী মানসিকতা, বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রভাব ,ক্রমবর্ধমান চাহিদা এ সব কিছু মিলিয়ে প্রচুর পরিমাণ কার্বন দহনের ফলে বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফল এখন এবং আগামীতে আমরা এবং সারা পৃথিবীর পরিবেশ ও জীবজগৎ ভোগ  করবে। বারবার হুঁশিয়ারি সংকেত শোনার পরেও  আমরা সচেতন হচ্ছি না বা হতে পারছিনা। 

 

আমাদের কৃত্তিম কর্পোরেট এবং স্বার্থান্বেষী মুনাফাভোগী মহল কে যদি এখনো থামানো না যায়, তবে ভবিষ্যতে আমাদেরই মাশুল গুনতে হবে। জাতিসংঘের এ বিষয়ক সংস্থা কে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে,পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে হবে এবং সব পর্যায়ে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। 

গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে কার্বন দহন বা গ্রীন হাউজ গ্যাস উৎপাদন হয় এমন প্রযুক্তির ব্যবহার, সাধ্যমত বৃক্ষরোপণ এবং পরিচর্যা এর সাথে সচেতনতার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তিপর্যায়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারি। এর মধ্য দিয়েই আমরা নিজেদের এবং আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে একটি বাস যোগ্য সুন্দর আবাসনে পরিণত করতে পারি। 

তথ্য সূত্রঃ

1.  S.B/D.G.A.P,Roiters (14.04.2014)

2. NASA GISS Report (12.01.2006)

3. Real Climate, 2005 Temperatures

4. BBC News (31.03.2014)

5. Peter M.Vitousek’s Research(02.12.2012)

 

সিরাজুম মনিরা
টিম: আলফা
ক্যারিয়ার ক্লাব অব আর্টস ফ্যাকাল্টি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
এই বিভাগের আরও