সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ||✍: আসাদুজ্জামান সম্রাট || ক্যারিয়ার ক্লাব অফ আর্টস ফ্যাকাল্টি (ক্যাফ) ||

এস এইচ/এস ই

১৭-১০-২০২০

This image is not found

ভূমিকাঃ

 

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Millennium   Development Goals-MDGs)হলো ২০০০ সালে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ শীর্ষ-বৈঠকের পর প্রতিষ্ঠিত আটটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষ্য। সেই সময় ১৯১ টি জাতিসংঘ সদস্য এবং কমপক্ষে ২২ টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০১৫ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। দারিদ্র্য, গুণগত শিক্ষার অভাব, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, মাত্রাতিরিক্ত শিশুমৃত্যু, এইডস্, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়ার মতো রোগব্যাধির মহামারির কারণে ব্যাপক হারে জনমৃত্যু ইত্যাদি বেশীরভাগ দেশের বহুকালের সমস্যা।এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারলে বিশ্বব্যাপী যে প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন সম্ভবপর নয় তা-ই অনুধাবন করে লক্ষ্যমাত্রাগুলো নির্ধারণ করা হয়। এই ব্যাপারটি অনুধাবন করে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানগণ সম্মিলিতভাবে অঙ্গীকার করেন যে, ২০১৫ সালের মধ্যে তারা নিজ নিজ দেশে আটটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবেন।

 

মহাসচিবের মতে MDG :

 

জাতিসংঘের প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনানের মতে, “জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন নয় বরং তা  হবে প্রতিটি দেশের সরকার ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে"

 

আটটি লক্ষ্যমাত্রাগুলো  হলো :


১.চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল করা।
২.সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন।
৩.লিঙ্গ সমতা উন্নীত করা এবং নারীর ক্ষমতায়ন।
৪.শিশু মৃত্যু হ্রাস করা।
৫.মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন।
৬.এইচআইভি / এইডস, ম্যালেরিয়া, এবং অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ।
৭.পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
৮.উন্নয়নের জন্য একটি বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বিকাশ।
তাছাড়া উপরিউক্ত লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য ১৮ টি সুনির্দিষ্ট টার্গেট ও ৪৫ টি নিদের্শক  আছে।

 

 

লক্ষ্যগুলোর মৌলিক আলোচনা :


লক্ষ্য চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলকরণঃ-
এই লক্ষ্যটি নির্ধারণের উদ্দেশ্য মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো যথাযথভাবে পূরণ করা।অর্থাৎ পুষ্টিকর খাদ্য, পোশাক, নিরাপদ পানি, বাসস্থান,
স্বাস্থ্যসুবিধা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে জীবনযাত্রার সার্বিক মান উন্নয়ন করা।


লক্ষ্য ২: সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন
এই লক্ষ্যটি অর্জনের উদ্দেশ্য ২০১৫ সালের মধ্যে সব ছেলেমেয়ে যাতে প্রাইমারি স্কুলে পূর্ণ শিক্ষাক্রম সমাপ্ত করতে পারে তা নিশ্চিত করা। শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা ভবিষ্যতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। শিক্ষা প্রতিটি মানুষকে ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য ও পছন্দ অনুযায়ী একটি সুন্দর জীবন গড়ে নেয়ার সুযোগ দেয়। শিক্ষিত নারী স্বল্পসংখ্যক সন্তানের জন্ম দেয় এবং সন্তানকে যথাযথভাবে বড় করে তুলতে পারে। তা ছাড়া শিক্ষার সাথেদারিদ্র্য, ক্ষুধা, শিশু ও মাতৃমৃত্যুহার হ্রাস প্রভৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।


◾লক্ষ্য-৩ : নারী-পুরুষ সমতা অর্জন ও নারীর ক্ষমতায়নে উৎসাহ দানঃ-
নারী-পুরুষ সমতা বলতে বোঝায় নারী ও পুরুষ সবাই যেন জীবনযাপনের মান উন্নয়নের সকল সুযোগ একইভাবে পায় তা নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাপী পুরুষদের তুলনায় নারীরা জীবনযাপনের অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। একজন নারী জন্মের পর থেকে জেন্ডার অসমতার শিকার হয় এবং পরবর্তীকালে সারা জীবন তাকে বিভিন্নক্ষেত্রে নারী হওয়ার কারণে সুবিধাবঞ্চিত হতে হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে নবজাতক ছেলেশিশুর তুলনায় মেয়েশিশুর মৃত্যুহার বেশি যার প্রধান কারণ জন্মের পর মা-বাবার অবহেলা। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের স্কুলত্যাগের হার অনেক বেশি। বিশ্বের ৮৮০ মিলিয়ন অশিক্ষিত প্রাপ্তবয়স্কদের তিন ভাগের দুই ভাগ নারী। পুরুষদের তুলনায় নারীদের অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের হারও অনেক কম। সারা বিশ্বে পার্লামেন্ট সদস্যদের মাত্র ১৬% নারী।আর বাংলাদেশে এ হার মাত্র ২ ভাগ।
নারীর প্রতি অসমতা দূর করা না গেলে এমডিজি’র কোনো লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব হবে।


লক্ষ্য - ৪ : শিশুমৃত্যুহার হ্রাসকরণঃ-
শিশুমৃত্যু হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০১৫ সালের মধ্যে শিশুমৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৫০ জনে নামিয়ে আনা। এ লক্ষ্যটির উদ্দেশ্য শিশুরা জন্মের পর থেকে যেসব স্বাস্থ্যসমস্যায় ভোগে সেগুলো দূর করে শিশুমৃত্যুহার হ্রাস করা।


লক্ষ্য - ৫ :  মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নঃ-এ লক্ষ্যটির উদ্দেশ্য মায়েদের সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়াটি নিরাপদ করার মাধ্যমে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানজনিত কারণে মাতৃমৃত্যুহার কমিয়ে আনা


লক্ষ্য - ৬:  এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগব্যাধি দমনএই লক্ষ্যটির উদ্দেশ্য ২০১৫ সালের মধ্যে এইচআইভি/এইডস্, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।


লক্ষ্য - ৭ :পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণঃ-
পৃথিবীব্যাপী উষ্ণায়ন বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দেখা দিচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। জলবায়ুর পরিবর্তন ও পরিবশগত স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হওয়ার কারণে পৃথিবী এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর তাই পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণকে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।


লক্ষ্য - ৮ : সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলাঃ-এ  লক্ষ্যটির উদ্দেশ্য ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দরিদ্র দেশগুলোকে জাতীয় আইন ও নীতিমালায় সকল নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সম্পদের সুষম বণ্টন, দুর্নীতি দমন এবং যুবসমাজের জন্য উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে ধনী দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান, শুল্ক হ্রাস ও ঋণ মওকুফের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

বিশ্বে সহস্রাব্দ উন্নয়নের প্রভাব :


বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষকে আর দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতে হবে না।
৩০০ মিলিয়ন মানুষকে আর কখনো ক্ষুধার কষ্ট ভোগ করতে হবে না।৩০ মিলিয়ন শিশু আর ৫ বছর বয়সের আগেই মারা যাবে না।২ মিলিয়ন নারী মাতৃত্বজনিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে।আরো অন্তত ৩৫০ মিলিয়ন মানুষের জন্য নিরাপদ পানীয়জলের ব্যবস্থা করা যাবে।আরো অন্তত ৩৫০ মিলিয়ন মানুষ স্যানিটেশন সুবিধার আওতাভুক্ত হবে।আশার কথা, বিশ্বব্যাপী এমডিজির  লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখনকার ৫টি দেশ ছাড়াও আরো ৫টি দেশ ২০১৫ সালের মধ্যে মোট জাতীয় আয়ের ০.৭% উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা হিসেবে দেয়া শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে (আয়ারল্যান্ড ২০০৭, বেলজিয়াম ২০১০, ফ্রান্স-স্পেন ২০১২ এবং যুক্তরাজ্য ২০১৩ সাল নাগাদ এটি বাস্তবায়ন করবে)। তবে ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে আরো ৫০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন যার অর্থ উন্নত দেশগুলোকে বর্তমান আর্থিক সহায়তার পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে।সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রসমূহ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

 

বাংলাদেশে সহস্রাব্দ উন্নয়নের প্রভাব : 

 

বাংলাদেশও খুব গুরুত্ব সহকারে  সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ২০০৭ সালে এসে এমডিজি অর্জনের পথে প্রায় অর্ধেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ১৪ কোটি মানুষের এই দেশে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা হিসাব করার সময় এসেছে। তাছাড়া বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুহার (প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্মদানে) ১৪৩ জনে নামিয়ে আনা। এ ছাড়া ২০১০ সালের মধ্যে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী বা ধাত্রীদের দ্বারা প্রজননসেবা গ্রহীতার হার ৫০ ভাগে উন্নীত করা, প্রতি হাজারে জন্মহার ২০২ জনে নামিয়ে আনা, মেয়েদের বিয়ের বয়সসীমা ২ বছর বৃদ্ধি এবং নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ এ লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত।। বর্তমানে সরকার মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত উপবৃত্তি চালু করেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ হাজারেরও বেশি পাবলিক ও নিবন্ধনকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রায় ৩০ হাজার অআনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় রয়েছে।১৯৯০ সালে বাংলাদেশে নবজাতক মৃত্যুর হার ছিল প্রায় প্রতি হাজারে ৯৪ জন। বর্তমানে এ হার প্রতি হাজারে ৫১ জনে নেমে এসেছে। বাংলাদেশকে লক্ষ্য অর্জনে ২০১৫ সালের মধ্যে নবজাতক মৃত্যুর এ হার প্রতি হাজারে ৩১ জনে নামিয়ে আনতে হবে। এক বছর বয়সী হামের টিকা গ্রহণকারী শিশুর আনুপাতিক হার ১৯৯০ সালে ছিল প্রতি ১০০ জনে ৫৪ জন, আর ২০০৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ জনে। নারী-পুরুষ বৈষম্য হ্রাস, নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও নারীর ক্ষমতায়ন স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচি প্রভৃতি এ উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।স্বল্পসংখ্যক দেশেই ২০১৫ সালের মধ্যে ৭ম লক্ষ্য অর্জনের জন্য চেষ্টা করা (যথেষ্ট অগ্রগতির করছে) হচ্ছে। পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকে শিক্ষাগত কার্যক্রম এবং সকল কর্মপন্থার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত করা দরকারর জন্য  এর প্রভাবকে প্রতিনিয়ত অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করছে।

 

 

এমডিজির লক্ষ্য অর্জনে তরুণ প্রজন্মের অবদান :

 

একজন সচেতন কিশোর-কিশোরী লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষা তরুণদের মধ্যে অধিকার সচেতনতা বাড়ায় এবং তাদের কণ্ঠকে সোচ্চার করে। দারিদ্র্য বিমোচনে অনেক তরুণই চববৎ ঊফঁপধঃড়ৎ হিসেবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়ার কাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে করছে। তরুণরা তাদের সমবয়সীদেরকে জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এসব বিষয়ে অনুপ্রাণিত ও পথ প্রদর্শন করতে পারে। বিভিন্ন কেস স্টাডি শোনানো এবং তার ওপর প্রশ্ন করার মাধ্যমে এ বিষয়ে মানুষকে কথা বলায় উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। নিজের পরিবারের সকলকে এবং বন্ধুবান্ধবদের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতে পারে। বিশেষ করে শহরে থাকলে বারান্দার টবে গাছ লাগাতে হবে।তাছাড়া এলাকায় এইডস রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধ বিষয় বিভিন্ন আলোচনা সভা করছে ।এভাবে তরুণ প্রজন্মের এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

আসাদুজ্জামান সম্রাট
টিমঃমুক্ত কন্ঠ
ক্যারিয়ার ক্লাব অব আর্টস ফ্যাকাল্টি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়     
 
এই বিভাগের আরও