সমাজতন্ত্র || ✍ : রাকিব হাসান || ক্যারিয়ার ক্লাব অফ আর্টস ফ্যাকাল্টি (ক্যাফ) ||

এস এইচ/এস ই

১৭-১০-২০২০

This image is not found

https://lh3.googleusercontent.com/pNu7sGSEfe6Fn_TJTZAGjzpPtNiQ2dinBGKrx8zhuDsC9LTkI-e-kER0SSsL4sS9KeUmPP4qybAEw9q85-x_5wWi8VRr2GbyHTcMpor-4KrihrLUuQ1_czaES9uwRlSSy9zPFsbuXA=

 

"কাজ করবো মোরা সামর্থ্য অনুযায়ী আর গ্রহণ করবো মোরা প্রয়োজন নুযায়ী"

 

এই  মূলনীতির অববাহিকার সমাজতন্ত্র  বা সমাজবাদ (Socialism) হচ্ছে এমন একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানা এবং অর্থনীতির একটি সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা,এছাড়াও একই সাথে এটি একটি রাজনৈতিক মতবাদ ও আন্দোলন যার লক্ষ্য হচ্ছে এই ধরনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।অর্থাৎ এটি এমন একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সম্পদ ও অর্থের মালিকানা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিমালিকানা থাকে না।সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে একটি দেশের কলকারখানা, খনি, জমি ইত্যাদি সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। সমাজতন্ত্র ব্যক্তিগত মালিকানার উৎখাত ঘটায় এবং মানুষে মানুষে শোষণ, অর্থনৈতিক সঙ্কট ও বেকারত্বের বিলোপ ঘটায়, উন্মুক্ত করে উৎপাদনী শক্তির পরিকল্পিত বিকাশ ও উৎপাদন সম্পর্কের পূর্ণতর রূপদানের প্রান্তর। সমাজতন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সামাজিক উৎপাদনের লক্ষ্য জনগণের স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি ও সমাজের প্রতিটি লোকের সার্বিক বিকাশ সাধন। সমাজতন্ত্রের মুলনীতি হলো:

 ''প্রত্যেকে কাজ করবে তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং প্রত্যেকে গ্রহণ করবে তার প্রয়োজন অনু্যায়ী''।

 

 

আর এর ফলে সমাজতন্ত্রে শ্রেণি শোষণ বিলুপ্ত হয়।সমাজতন্ত্রের ইতিহাসের উৎপত্তি ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং তার থেকে উদ্ভূত পরিবর্তনের ভেতরে নিহিত, যদিও এটি আগের আন্দোলন এবং ধারনা থেকেও বিভিন্ন ধারনা গ্রহণ করেছে। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের লেখা কমিউনিস্ট ইস্তেহার বইটিতে সমাজতন্ত্র কথাটি ব্যবহার করা হয়।  ইউরোপে ১৯ শতকের শেষ তৃতীয়াংশে মার্কসবাদকে গ্রহণ করে সমাজ গণতান্ত্রিক দলগুলো উপরে আসতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ান লেবার পার্টি বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক পার্টি যখন পার্টি ১৮৯৯ সালে কুইন্সল্যান্ড রাজ্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল।  

তথ্যসূত্র

↑ Blainey, Geoffrey (২০০০)। A shorter history of Australia। Milsons Point, N.S.W.: Vintage। পৃষ্ঠা 263।

 

১৯৯১ সালে ভেঙে গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই থেকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্দিনের শুরু। সোভিয়েত ব্লকের পতনের পর থেকে হাতে গোনা কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কিউবা, চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও লাওস অবশ্য মুক্তবাজার অর্থনীতির সূতিকাগার পশ্চিমা বিশ্বে ইদানীং সমাজতন্ত্র নতুন রূপে আবির্ভূত হতে শুরু করেছে। তবে কি আবার ফিরতে চলেছে সমাজতন্ত্রের সুদিন?

 

কারণ বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে সমাজতন্ত্রের ঢেউ উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ এই পশ্চিমা বিশ্বই একসময় সমাজতন্ত্রের প্রবল বিরোধী ছিল। উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা বেশ পুরোনো। সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা সারা বিশ্বেই রয়েছে। তেমনি এ দেশেও সমাজতন্ত্রীরা নানা ভাগে বিভক্ত। মূল ধারা দুটি—একটি হলো সাবেক সোভিয়েতপন্থী, আর অন্যটি মাওবাদী। তবে এর বাইরেও আরও নানা দল-উপদল আছে।

 

 

১৯৯১ সালে ভেঙে গিয়েছিল সোভিয়েত ব্লক। শেষের দিকে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েই এর দফারফা হয়েছিল। সৃষ্টি হয়েছিল বৈষম্যও। অথচ এই সমাজতন্ত্রে ভর করেই একদা সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রবল প্রতিপত্তির অধিকারী হয়েছিল। অর্থাৎ, এই ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’ বলা যাবে না।

কিন্তু কেন এতে ঘুণ ধরেছিল? এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা সেই আমলাতন্ত্র ও সম্পদের বৈষম্যকেই দায়ী করেছেন। যে বৈষম্য দূর করতে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম হয়েছিল, সেই বৈষম্যেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল তা। একই সঙ্গে তৎকালীন কঠোর নিয়মকানুনের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ দেখা দিয়েছিল।

 

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে উপমহাদেশে ভারত ভাগ হয়। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তিও ঘটে। পরে বাংলাদেশের জন্ম হয়। এই পুরো সময় সমাজতন্ত্রীদের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। তবে ওই সময়ের বৈষম্য আর আজকের বৈষম্যের ধরন ও তীব্রতা কিন্তু এক নয়। আমাদের দেশের সমাজতন্ত্রী দলগুলো সেই সত্য অনুভব করতে পারছে কি না, সেটি একটি প্রশ্ন। অন্তত ভোটের রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রীরা যে এখনো ঠিক সুবিধে করতে পারছে না, তা নির্বাচনের ফলাফল থেকেই স্পষ্ট। আবার আন্দোলনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অর্জনও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং এটি মেনে নিতেই হবে যে কোথাও গলদ রয়েই যাচ্ছে।

 

শুধু রাজনীতি নয়, যেকোনো ক্ষেত্রেই সফল হতে হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন খুব জরুরি। হালনাগাদ হতেই হয়, তা না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়। আন্তর্জাতিকভাবে যেভাবে সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, দুঃখের বিষয় হলো এ দেশে তা এখনো শুরুই হয়নি। এখনো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। সোভিয়েত  ও চীনের মধ্যে কোনটি ভালো—সেই বিতর্কও চলমান। অথচ দুটি ঘরানাই এখন আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, এই ভূখণ্ডের মানুষ সমাজতন্ত্রকে কীভাবে চায়, সেটি কি জানা সম্ভব হয়েছে? সে–সংক্রান্ত কোনো জরিপ বা গবেষণা কি দলগুলো করছে?

 

 

রাজনীতির প্রধান উপাদান জনগণ। তাই জনমানুষের মনোভাব জানতে ওপরের প্রশ্নটির উত্তর জানা জরুরি। এ জন্য জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তা না হলে সমাজতান্ত্রিক ধারা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তা দিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব হবে না। উল্টো মিটিং-মিছিলেই স্থবির থাকবে সমাজতান্ত্রিক ভাবনা। যদিও আমরা গনতন্ত্রপন্থী কিন্তু সমাজতন্ত্র ছাড়া গনতন্ত্র হলো একটি পোড়া রুটির মতো।

 

*কেউ খাবে, তো কেউ খাবে না– তা হবে না, তা হবে না।

 

*কেউ দালানে, কেউ গাছতলায়– তা হবে না, তা হবে না।

 

*কেউ লেখাপড়া শিখবে, কেউ শিখবে না– তা হবে না, তা হবে না।

 

*কেউ কাজ পাবে, কেউ পাবে না– তা হবে না, তা হবে না।

 

সবাই খাবে, সবাই পরবে, সবাই লেখাপড়া শিখবে, সবাই ভালো ঘরে থাকবে, সবাই কাজ পাবে। কেউ অনাহারে থাকবে না, শিক্ষা ছাড়া থাকবে না, ঘরহীন থাকবে না, বেকার থাকবে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিকে তাকালে আমরা দেখি, ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ এই প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আর আমাদের এখনকার প্রশ্ন হচ্ছে, ‘স্বাধীন বাংলায় গরিব কেন’। এই প্রশ্ন আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি করে, যে বাস্তবতায় এখনও কৃষক-শ্রমিক-মজুর-গরিব-নারী-শিশুর অধিকার ও মর্যাদার কমতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে আমাদের। এ কারণেই অক্টোবরের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা রুশ বিপ্লব বাংলাদেশের জন্য এখনও প্রাসঙ্গিক। অক্টোবর বিপ্লবই এই মেহনতী মানুষের অধিকার, মর্যাদা আর স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করেছে সমগ্র বিশ্বের রাজনীতিতে। অসমতার বিরুদ্ধে জনতার আন্দোলন জাগিয়ে রেখেছে, সমতার সমাজ গড়ার মন্ত্র যুগিয়েছে এই বিপ্লব।সমাজতন্ত্রের সরকার থাকুক, না থাকুক, শতবর্ষ আগের সেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কারণেই শ্রমিকেরা পেয়েছে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার; নারীরা পেয়েছে ভোটের অধিকার; কৃষক পেয়েছে তার ফসলের অধিকার। তাই পথে-প্রান্তরে আমাদের প্রত্যেককে আজ থেকে একটি প্রশ্ন উচ্চারণ করতে হবে, ‘স্বাধীন বাংলায় গরিব কেন’।যেখানে সমাজতন্ত্র ছাড়া গনতন্ত্র হলো একটি পোড়া রুটির মতো সেখানে গনতন্ত্র বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। 

 

 

রাকিব হাসান রাজু
টিমঃ মুক্ত কন্ঠ
ক্যারিয়ার ক্লাব অব আর্টস ফ্যাকাল্টি 
চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
এই বিভাগের আরও