রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ || ✍: মো: আলাউদ্দিন || ক্যারিয়ার ক্লাব অফ আর্টস ফ্যাকাল্টি (ক্যাফ) ||

এস এইচ/এস ই

১৭-১০-২০২০

This image is not found

[এই গবেষণা নিবন্ধে কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা উপস্থাপিত হয়েছে। ঘটনা প্রবাহের সাথে সাথে ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্য ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে পারে]

 

 

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী বা উদ্বাস্তু বলতে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে আগতরোহিঙ্গা শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের বুঝানো হয়ে থাকে।রােহিঙ্গা' হলাে পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি রাষ্ট্রবিহীন ইন্দো-আরিয়ান জনগােষ্ঠী । খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে রাজা মহত ইং চন্দ্রের আরাকান অঞল শাসনের সময় বামবি দ্বীপের তীরে আরব বণিকদের একটি জাহাজ ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু আরব তীরে এসে সাহায্য প্রার্থনা করলে রাজা তাদের সাহায্য করেন। তারা স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে বসতি স্থাপন শুরু করে। এরাই রােহিঙ্গা হিসেবে ক্রমশ পরিচিতি পায়। তারা রাজদরবারে মুসলিম উপদেষ্টা ও সভাসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চৌদ্দ শতকে। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুশ বছরের বেশি স্থায়ী হয়।১৯৩৭ সালে বার্মা ইংরেজদের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক ও ভয়াবহ রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লক্ষ রােহিঙ্গা মুসলিম হত্যা করে। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভের পর সরকার রােহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দূরে থাক, মানবিক অধিকারটুকুও দেয়নি। ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার রােহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়। তাদেরকে  শুধুই বসবাসকারী নামে উল্লেখ করে।এর আগে রােহিঙ্গাদের ওপর বড় সামরিক হামলা হয় ১৯৭৮ সালে। ১৯৯১-৯২ সালে রাখাইন স্টেটে রােহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দমনের নামে জাতিগত নির্যাতন শুরু করে। এ সময় লক্ষাধিক রােহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ২০১২ সালে রাখাইন নারী হত্যাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় রাখাইন রােহিঙ্গা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এ সময় শতাধিক রােহিঙ্গা মারা যায় এবং গৃহহীন হয় লক্ষাধিক রােহিঙ্গা ।

 

মানুষ পৃথিবীতে এসেছে নিজ নিজ অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য। সে অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি রয়েছে জাতিসংঘ সনদে, মানুষের বিবেক ও নৈতিকতায়।এ মুহূর্তে যতগুলাে রাজনৈতিক টানাপড়েন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, কূটনৈতিক জটিলতা ও তৎপরতা বিদ্যমান রয়েছে সেগুলাের মধ্যে রােহিঙ্গা ইস্যুটি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। এর সাথে রয়েছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১১লক্ষ রােহিঙ্গার স্বদেশে ফিরে যাওয়ার প্রসঙ্গ। কেননা, দীর্ঘদিন তাদেরকে আশ্রয় দেওয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। কাজেই এ সমস্যাটি এখন আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলকে রীতিমতাে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

৩ জুন, ২০১৭ থেকে পূর্বপরিকল্পিত ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা শুরু করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসী রাখাইন বৌদ্ধরা। তারা সেনা, পুলিশ, নাসাকা বাহিনীর সহায়তায় গণহত্যা চালাচ্ছে, মসজিদ-মাদরাসা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, লুটপাট, ধর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। এ রকম নৃশংস অবস্থার নির্মম শিকার হয়ে প্রাণের ভয়ে উত্তাল সাগর অতিক্রম করে দুর্গম এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে লক্ষ লক্ষ রােহিঙ্গা। আরাকানে সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নৃশংসতার চিহ্ন নিয়ে বাংলাদেশে রােহিঙ্গাদের প্রবেশ এখনও অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় সাগরে সলিল সমাধি হয়েছে বেশ কিছু সংখ্যক রােহিঙ্গার। আগস্ট, ২০১৭ সালে নতুন করে ভয়াবহ মুসলিম নিধন অভিযানে নির্যাতিত, নিপীড়িত, ধর্ষিত প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ রােহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। বর্তমানে সাত লক্ষেরও অধিক রােহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ সাধ্যমতাে তাদের আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসার জোগান দিলেও রােহিঙ্কারা এখানে উদ্বাস্তু- আশ্রিত। রােহিঙ্গারা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক।  রােহিঙ্গারা নিজ দেশে পরবাসী। মিয়ানমার সরকার তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। তাই নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। তারা এখন বসবাসকারী মাত্র । তাদের নাগরিক ও মৌলিক কোনাে সুযােগ-সুবিধা নেই। সরকারের দৃষ্টিতে তাৱা অভিবাসী বা  বিদেশি । তাই তারা স্থায়ী কোনাে ভূমি বা সম্পদের মালিক হতে পারে না। তারা সরকারি চাকরি বা সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত। তারা ব্যাংক লেনদেন করতে পারে না, চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে পারে না, বিদ্যুৎ, পানি বা জ্বালানির জন্য আবেদন করতে পারে না। এরা ৮০% নিরক্ষর, কারণ এরা স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। রােহিঙ্গাদের জন্য কিছুসংখ্যক গ্যাটো জাতীয় ব্যবস্থা আছে। সেখানে চিকিৎসা, শিক্ষা ও উপযােগ সেবা সীমিত ও নিম্নমানের। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া তারা বিয়ে করতে পারে না এবং দুটোর বেশি সন্তান নিতে পারে না। অতিরিক্ত সন্তান যারা গ্যাটোর অধিভুক্ত নয় তারা মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের পথে পা বাড়ায় । সব মিলিয়ে রােহিঙ্গারা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক। 

২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালে মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর দ্বারা শুরু হওয়া গণহত্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রায় ৬,৫৫,০০০ থেকে ৭,০০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ মুহূর্তে কক্সবাজারে সব মিলিয়ে অন্তত ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া, ভারতের হায়দ্রাবাদের রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, ফলে মায়ানমারের মতো তারাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।

 

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭৩ তম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাবলেছিলেন যে বাংলাদেশে এখন ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলিতে সাম্প্রতিক জনসংখ্যার উপচে পড়া ভিড় তার পরিকাঠামোয় এক চাপ সৃষ্টি করেছে।  শরণার্থীদের পরিষেবা, শিক্ষা, খাদ্য, পরিষ্কার জল এবং সঠিক স্যানিটেশনের অ্যাক্সেসের অভাব রয়েছে;  তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সংক্রামক রোগ সংক্রমণেও ঝুঁকিপূর্ণ।

 

২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশন, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, এবং সামাজিক সুরক্ষা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রয়োজনীয়তা মোকাবেলায় আর্থিক সহায়তায় প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার ঘোষণা করেছে। ১ মার্চ ২০১৯ এ বাংলাদেশ ঘোষণা করেছে যে তারা আর নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণ করবে না।

 

Ontario International Development Agency, Canada,  এর তথ্য অনুযায়ী  আগস্ট ২০১৮ এর একটি সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে যে ২৫ আগস্ট ২০১৭ "নিধন কার্যক্রম" শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা ২৪,০০০ এরও বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছিল। এই সমীক্ষায় আরও অনুমান করা হয়েছিল যে কমপক্ষে ১৮,০০০ রোহিঙ্গা মুসলিম মহিলা ও মেয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে, ১১৬,০০০ রোহিঙ্গাকে  মারধর করা হয়েছিল এবং ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৩৬,০০০ রোহিঙ্গাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।

 

 

"Impacts of the Rohingya Refugee Influx on Host Communities - Bangladesh"-এর মতে,২০১৮ সালের মে হতে জুন মাসে চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে রোহিঙ্গারা ত্রাণের পণ্য স্থানীয়দের মধ্যে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। তারা চাল, মসুর এবং খাবার তেল বেশি বিক্রি করছিল। ফলে স্থানীয় দোকানদারদের বিক্রি কমে যাচ্ছিল। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের দ্বারা অন্যান্য পণ্য যেমন, মাছ, মাংশ, আলু, সবজি ও জ্বালানি কাঠের ক্রয় বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাজারে এইসব পণ্যের মুল্য বৃদ্ধি পায়।

 

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমনের পর স্থানীয় দিনমজুরদের মজুরী কমে গেছে। বিশেষত কৃষি কাজ ও অদক্ষ শ্রমিকরা এতে আক্রান্ত হয়েছে। বিপুল পরিমান রোহিঙ্গা রোজগারের স্বার্থে কম মজুরীতে কাজ নেয়ায়, স্থানীয়দের কম মজুরীতে কাজে নামতে হয়েছে।

 

এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, বাংলাদেশের মানুষ অতিথিপরায়ণ, উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। তাছাড়া এদেশের জনগণ এবং সরকারের এ বিষয়টা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ আছে যে, ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়ে এদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রায় একই ভয়াবহ অবস্থার নির্মম শিকার হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু অসহায় রােহিঙ্গা দুর্গম পথে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে আশ্রয়ের জন্য ছুটে এসেছে। বাংলাদেশের মানবিক দুর্বলতার এটাও অন্যতম কারণ। প্রথমদিকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও বিজিবি তাদেরকে ঢুকতে বাধা দিলেও পরবর্তীতে আশ্রয়ের সুযােগ দিয়েছে। স্রোতের মতাে ভয়ার্ত, ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, নিরাশ্রয় ও অত্যাচারিত রােহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য ছুটে এসেছে এবং এখনও আসছে।

 

আয়তনে ছােট বাংলাদেশ এখনও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। তার কি সাধ্য আছে এ বিপুল সংখ্যক মানুষকে খাওয়া, থাকা, চিকিৎসার প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে? তবুও সীমিত সাধ্য নিয়েই এ দেশের সরকার এবং সহানুভূতিশীল ব্যক্তিবর্গ তাদের জন্য এগিয়ে এসেছে। তারা তাদের জন্য খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসার সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে আসা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের জন্য সাময়িক আশ্রয় নির্মাণ করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে সংগৃহীত খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে সেনাবাহিনী। চিকিৎসক দল আন্তরিকভাবে তাদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আশ্রিত রােহিঙ্গাদের অসহায় অবস্থা সরেজমিনে দেখে এসেছেন। তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে সাহায্য-সহযােগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রয়ােজনীয় সামগ্রী পৌছে দিচ্ছেন আশ্রিত রােহিঙ্গাদের জন্য। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরাও তাদের জন্য চাল, ডাল, শুকনাে খাবার, কাপড়-চোপড়, পানি ইত্যাদি পৌছে দিচ্ছেন। সেসব জিনিস দুর্ভোগগ্রস্ত আশ্রিতদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে সুশৃঙ্খলভাবে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, জাতিসংঘ, ইউরােপীয় ইউনিয়ন, ওআইসির প্রতিনিধিরা রােহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য এবং প্রয়ােজনীয় সামগ্রী সুশৃঙ্খলভাবে বিতরণের জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৎপরতা

 

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন বৌদ্ধরা জাতিগত সহিংসতা ও অত্যাচার-নিপীড়নের মাধ্যমে রােহিঙ্গাদের প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছে, এ বিষয়টা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন করেছে। তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংস কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশের মানবিক আচরণের প্রভূত প্রশংসা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরােপীয় ইউনিয়ন, ওআইসির প্রভাবশালী প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে অবস্থানরত ও প্রবেশরত রােহিঙ্গাদের অবস্থা দেখেছেন এবং সেনাবাহিনীর অত্যাচারের বর্ণনা শুনেছেন। তাতে তারা সহজেই বুঝতে পেরেছেন যে, নাগরিকত্বহীন মানুষদের বিতাড়িত করার সুযােগটাই সেনাবাহিনী গ্রহণ করেছে এবং তাদের ওপর অমানবিক ও নৃশংস অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের রােহিঙ্গাদের ওপর চালানাে দমন ও নির্যাতনকে জাতিগত নির্মূলতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রােহিঙ্গাদের সমস্যাটি নিয়ে মিয়ানমারকে বাংলাদেশের সঙ্গে কার্যকর আলােচনা করতে চাপ দেবেন। 

 

যুক্তরাষ্ট্র সরকার রােহিঙ্গা নিধন ও নির্যাতন বন্ধ করার জন্য মিয়ানমারকে সতর্ক করে দিয়েছে। রাখাইন রাজ্যে রােহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস ও নিপীড়ন বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ১৫৭ জন এম.পি.। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য কার্যকর কোনাে ব্যবস্থা গ্রহণের তৎপরতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেই। তবে বাংলাদেশে আশ্রিত রােহিঙ্গাদের সাহায্য করার তৎপরতা তাদের রয়েছে। 

 

 

জাতিসংঘের অবস্থান :

 

মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতা, হত্যা ও নির্যাতনের ভয়াবহতার প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিশন পাঠিয়েছিল। সেই তদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রােহিঙ্গারা অতি-জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধদের দ্বারা ঘৃণা ও ধর্মীয় অসহিংসতার শিকার হচ্ছে। একই সাথে সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যা, অবৈধ গ্রেফতার, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং অপব্যবহারের শিকার হচ্ছে এবং তাদেরকে নিয়ে জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করছে। জাতিসংঘের মতানুসারে,তাদের ওপর চলা এ নির্যাতনকে মানবতাবিরােধী অপরাধ বলা যেতে পারে। এ সমস্যার সমাধানে কফি আনানের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘ মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে দুদফা বৈঠকও করেছে। এদিক থেকে জাতিসংঘের অবস্থান ইতিবাচক।

 

 

কীভাবে সমাধান করা যায়?

 

মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতা এবং রােহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা— এ দুটি বিষয়ই খুবই জটিল ও স্পর্শকাতর। তাৎক্ষণিকভাবে এ সমস্যার সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে জাতিসংঘসহ কয়েকটি দেশ জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিক কফি আনানের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের পক্ষপাতী। কারণ তার সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালাই কেবল এ সমস্যার সুষ্ঠু ও স্থায়ী সমাধান দিতে পারে। তবে সার্বিক বিবেচনা করে সমস্যা সমাধানের জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশগুলাে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। জাতিসংঘ, বিমসটেক ও আসিয়ানের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে : 

 

◾মিয়ানমার সরকারকে জাতিগত সহিংসতা ও হত্যা-নির্যাতন বন্ধ করতে বাধ্য করা।

 

◾  বাংলাদেশে আশ্রিত রােহিঙ্গাদের অবিলম্বে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া। 

 

◾১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিক অধিকার আইন সংশােধন করে রােহিঙ্গা জনগােষ্ঠীকে নাগরিকত্ব প্রদান করা ও তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

 

◾১৯৯২ সালের চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে দু'দেশের প্রয়ােজনীয় আলােচনা করা ও চুক্তি  যথাযথভাবে অনুসরণ করা। 

 

◾জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলাের বাংলাদেশে আশ্রিত রােহিঙ্গাদের দুর্ভোগ মােচনে অধিকতর ত্রাণসামগ্রী প্রদান করা। 

 

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই শান্তিকামী। কোনাে দেশই জাতিগত সহিংসতা, হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন প্রত্যাশা করে না। দেশের কোনাে বিশেষ এলাকার বা সম্প্রদায়ের মানুষকে নাগরিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করা অনৈতিক ও অমানবিক অপরাধ । আবার নিজ দেশের মানুষকে যেকোনাে ছুতােয় পার্শ্ববর্তী দেশে জোর করে পুশ করা সেটাও অমানবিক ও অসংগত। বরং আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে যেকোনাে কঠিন সমস্যার সমাধান করাই বাঞ্ছনীয়। মিয়ানমারের শুভ ও কল্যাণকর মনােভাব তৈরি হােক এবং উদ্ভূত সমস্যার যৌক্তিক সমাধানের পথ প্রশস্ত হােক— এটা এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের আশাবাদ। রােহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা হলে বাংলাদেশও বিশাল দায়িত্ব থেকে মুক্তি পায়। বিশ্ব সম্প্রদায় এ বিষয়ে কার্যকরভাবে তৎপর হলেই কেবল রােহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হবে।

আমার কাছে মনে হয়, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশকে যে দেশটি সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারে, সেটি হচ্ছে চীন৷ বর্তমানে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে, বা সহজ করে বললে বাংলাদেশকে নিজেদের মিত্র হিসেবে আরো কাছে টানতে চীন অনেক কিছু করছে৷ বাংলাদেশ চাইলে এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান করে ফেলতে পারে বলে আমার বিশ্বাস৷ চীন চাপ দিলে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের কিছু অধিকার নিশ্চিত করে ফেরত নিতে পারে৷

 

তবে, এভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো না গেলে বিকল্প আর কী কী হতে পারে সেটাও ভাবা উচিত৷ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গাকে একসঙ্গে বাংলাদেশ ফেরত পাঠাতে পেরেছিল ১৯৭৯ সালে৷ কোন প্রক্রিয়ায় সেটা সম্ভব হয়েছিল, তাও মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

 

মোদ্দা কথা হচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার মাথাব্যাথা নয়৷ গোটা বিশ্বের দায় রয়েছে এই সমস্যা সমাধান করার৷ আর রোহিঙ্গাদের তাদের অধিকারসহ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোটাই সংকটের একমাত্র সমাধান৷ এই সমাধান যত দ্রুত মিলবে ততই মঙ্গল৷

 

 

তথ্যসূত্র-

১. বিবিসি নিউজ 

২. ডি ডব্লিউ নিউজ

৩. দৈনিক প্রথম আলো 

মোঃ আলাউদ্দিন
টিমঃ উদ্দীপ্ত তারুন্য
ক্যারিয়ার ক্লাব অব আর্টস ফ্যাকাল্টি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
এই বিভাগের আরও