গল্প : চোরের মানবতা || ✍ মোহাম্মদ ফয়সাল || পূর্ব-পশ্চিম

১২-৮-২০২০

This image is not found

চলন্ত বাসে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ে উঠল মাহমুদ। সিট ফাকা আছে শেষের দিকে ৩ সারী। গাড়ি সন্ধার আলো আধারীতে ব্যস্ততম শহর ঢাকা ছেড়ে মাওয়ার উদ্দেশ্য  প্রানপনে ছুটছে।মাহমুদ গুলিস্তানের একটি জুতার কারখানায় কাজ করে। জুতার আঠা লাগানো আর কারখানা থেকে বস্তাভর্তি করে মাথায় নিয়ে শো-রুমে নেওয়াই তার নিত্যদিনের কাজ।

অল্প বয়সে বিয়ে করে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন সে।ছেলেবেলা থেকে দুরন্ত স্বভাব তার।পরিবারে তিন মেয়ের পর যখন তার জন্ম বাবা মা আকাশের চাঁদ হাতে পেল।তবে দুষ্টমিকে সঙ্গী করেই পথচলা তার। 

একবার বাবার সাথে নিজেদের জমিতে অন্য কৃষকদের নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সে জান্ত তাকে যোহরের আজান পর্যন্ত থাকতে হবে। তাই সে একটু দূরে গিয়ে নিজে আজান দিয়েছে। কারো কাছে ঘড়ি না থাকায় সময় শেষ হয়েছে ধারণা করে কৃষকেরা অনেক সময় থাকতেই চলে গিয়েছিল। 

হঠাৎ বাস থামায় ঘুম ঘুম ভাব কেটে গেছে।সে দেখল  একজন কম বয়েসী নারী তার মেয়েকে নিয়ে বাসে উঠে তার পাশের সীটে বসল।কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় জেলখানার সামনে থেকে বাস চলা শুরু করল।মহিলা চিন্তিত মুখে বসে আছে। তার স্বামী দীর্ঘদিন যাবত কারাগারে আছে।সে কয়েকদিন পর পর এসে দেখে যায়।সাক্ষাতের সময় কয়েকটা কথা বলার পর গলা ধরে আসে শেষটা হয় চোখের জলে।মেয়েটা শুধু বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকে। 

মাহমুদ প্রথম চাকরির বেতন পেয়ে বাড়ি যাচ্ছে। তাই মনটা চঞ্চল হয়ে আছে।বাবার জন্য পাঞ্জাবি, মায়ের জন্য শাড়ী, বোনদের জন্য তাদের চাহিদা অনুযায়ী জিনিসপত্র, নতুন বউয়ের জন্য নীল রঙের কাচের চুড়ি আর কানের দুল কিনেছে সে।সবাই তার উপহার পেয়ে কেমন খুশি হবে এসব ভাবতে ভাবতেই মাওয়া ঘাটে বাস পৌঁছে গেছে। 

বাস থেকে নামার পর মাহমুদ দেখল আকাশে বৃষ্টির ভার করেছে।অস্থির মনের সাড়া দিতে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার জন্য লঞ্চ থেকে স্পীডবোর্ডে উঠে পড়ল।বোর্ডে ৩ জন ছিল মাহমুদকে নিয়ে ৪ জন হল।বোর্ডওয়ালা বলল রাতের শেষ ট্রিপ আর ২/১ জন হলে চলে যাব।বলতে বলতেই ঐ মহিলা আর এক বৃদ্ধ উঠে আসল বোর্ডে। বোর্ডওয়ালা আরও ২/১ জনের অপেক্ষায় ছিল কিন্তু যাত্রীদের তাড়াহুড়ো আর বৃষ্টির কথা চিন্তা করে বোর্ড চালাতে শুরু করল।

কাওড়াকান্দির কাছাকাছি আসার পর হঠাৎ স্পীড বোর্ড থেমে গেল।কোনো কিছু বুজে উঠার আগেই বোর্ডে প্রথম উঠা ৩ জন যাত্রী ৩ টা রামদা বের করে বলল যা কাছে যা আছে দিয়া দেন।কোনো চিল্লাচিল্লি করলে মাথা কাইটা পানিতে ভাসাইয়া দিমু।মাহমুদ একজনের কাছ থেকে একটা রামদা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে আরেকজন রামদার উল্টো পিঠ দিয়ে একটা বারি মারল। আল্লাগো বলে বোর্ডের ভিতর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে। মহিলা এমনিতেই স্বামী আর সংসার নিয়ে শোকে পাথর ছিল। মোবাইল, মানিব্যাগ, স্বর্নের চেন, ব্যাগ যার যা ছিল সব নিয়ে নিল ছিনতাইকারী চোরেরা। 

কার বাড়ি কোথায় এটা জিজ্ঞেস করল চোরেরা।বাড়িতে যাওয়ার গাড়ি ভাড়া দেওয়া হল তাদের।মাহমুদ ভয়ে আর দুঃখে নিতে চাইল না। হঠাৎ বৃষ্টিতে সবাই ভিজে গেল। প্রথমে ২০ টাকা দেওয়া হলে চোরদের মধ্যে একজন বলল রাতে অটোওয়ালা সালারা ভাড়া বেশি নেয় আর ১০ টাহা বাড়ায়ে দাও।৫০ টাহা বারাইয়া দেইয়া দে, বোর্ডওয়ালা বলল।সে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।আরেকজন বলল, বৃষ্টিতে ভিজছস ঠান্ডা লাইজ্ঞা যাইব।টাহাডা নিয়া তাড়াতাড়ি চলে যা।মাহমুদ চোরদের উদার মানবিকতা দেখে চোরদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তখন তার অবস্থা রবি ঠাকুরের 
          "মুখের পানে চাহিনু অনিমেষ, 
             বাজিল বুকে সুখের মত ব্যথা "।

" আমরা সবাই ভালো আমাদের এই ভালোর রাজত্বে"।

 

লেখক ✍ : মোহাম্মদ ফয়সাল
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 


সম্পাদনায়: সাজ্জাদ হোসেন 

এই বিভাগের আরও