গল্প : গন্তব্য || ✍ ইয়াসিন আরাফাত বিজয় || পূর্ব-পশ্চিম

২৯-৭-২০২০

This image is not found

গন্তব্য 

 

বাসটি আমাকে চৌরাস্তায় নামিয়ে দিয়ে উত্তরমুখী রাস্তাটি ধরে চলে গেলো। বাসে করে আরো কিছুক্ষণ যাওয়া যেতো, কিন্তু বাসের গন্তব্য উত্তর দিকে আর আমার গন্তব্য দক্ষিণ দিকে বলে তা আর হয়ে ওঠলো না। কোনো রিকশা বা সিএনজি খুঁজছি, কারণ আমার গন্তব্য এখনো যথেষ্ট দূরে ; অতোটুকু পথ হেঁটে যাওয়াটা কষ্টকর হবে। কিন্তু কোনো গাড়িই আপাতত দেখতে পাচ্ছি না। আমি আরো কয়েকবার রাতের বাসে চট্টগ্রাম থেকে এসেছিলাম এবং প্রতিবারই চৌরাস্তায় কোনো না কোনো রিকশা অথবা সিএনজি পেয়েছিলাম। কিন্তু এইবার তো দেখছি রাস্তাঘাট ফাঁকা, গাড়ি তো থাক দূরের কথা, কোনো মানুষজনই দেখতে পাচ্ছি না। ঘড়ির সময় দেখার জন্য পকেট থেকে মোবাইল বের করলাম। ৪:১৩ টা বাজে! অগত্যা হাঁটতে শুরু করলাম।

এ কি! দূরে মনে হচ্ছে কেউ একজন ফুটপাথে বসে আছে। কাছে যেতেই দেখলাম একটি সাদা কামিজ পরিহিতা মেয়ে, পাশে একটি ভ্যানিটিব্যাগ।

- আপু, কোনো সমস্যা? 
- ভাই, আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবেন?
- জ্বী বলুন, কী সাহায্য?
- আমি আসলে......
- সমস্যা নেই, নিঃসংকোচে বলে ফেলুন।
- আমি আসলে রংপুর থাকি। আমি বাড়ি থেকে এখানে আমার প্রেমিকের কাছে পালিয়ে এসেছিলাম। সাথে করে গয়না আর কিছু টাকাপয়সা এনেছিলাম। ওর কাছে আসার পর আমি ওর মেসে গিয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু ও যে এতোটা নিচ প্রকৃতির, তা আমি জানতাম না। সে আমার গয়না আর টাকাপয়সা কেড়ে নিয়ে আমাকে খুন করতে উদ্যত হয়। আমি কোনোরকমে পালিয়ে এসেছি। সে এখনো আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে! আপনি দয়া করে আমাকে রংপুর যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন, সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো!

মেয়েটির কথা শতভাগ বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না। মেয়েটি এভাবে পালিয়ে এসে এখানে কেন বসে আছে? অন্য কোথাও কেন আশ্রয় নিলো না? এইরকম অনেক প্রশ্ন মনে উঁকি দিচ্ছে। আবার একটি মেয়েকে এভাবে রাতের বেলা একা ছেড়ে দেয়াটাও ঠিক হবে না। শেষ পর্যন্ত সাতপাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম মেয়েটিকে আমি সাহায্য করবো।

- দেখুন, এতরাতে কোনো গাড়ি পাওয়া যাবে না। তারচেয়ে বরং আমরা হাঁটতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে সকাল হয়ে যাবে। তখন না হয় আপনাকে বাসে তুলে দেয়া যাবে।
- আচ্ছা, ঠিক আছে।
- আপনার নামটাই তো জানা হলো না।
- আমার নাম আদ্রিতা। আপনার?
- ওহ, সুন্দর নাম! আমার নাম বিজয়।
- আপনি কোত্থেকে আসছিলেন?
- আমি আসলে চট্টগ্রাম থেকে ফিরছিলাম, আসতে আসতে রাত হয়ে গেলো। 
- ও আচ্ছা। সামনে একটি চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। চলুন, চা খেয়ে নিই।
- ঠিক আছে, চলুন!

দোকানটির দিকে হাঁটতে থাকলাম। হঠাৎ পাশের একটি গলি থেকে একটি ছেলে বেরিয়ে আসলো! হাতে বড় একটা ছুরি। আদ্রিতা ছেলেটিকে দেখে ভড়কে গেলো এবং আমার পেছনে লুকিয়ে পড়লো। ছেলেটি খুব হিংস্রতার সাথে এদিকে এগিয়ে আসছে! একটু এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়লো।

- দেখুন, আপনার সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই। সুতরাং আমি চাই না আপনার সাথে আমার কোনো দ্বন্দ্ব হোক। চুপচাপ আমার রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ান আর আদ্রিতাকে আমার হাতে তুলে দিন।
- না, প্লিজ এমন করবেন না! এই ছেলেটাই আমার প্রেমিক, আপনি আমাকে ওর হাতে তুলে দিলে আমাকে খুন করে ফেলবে! (আদ্রিতা)
-কোনো অপরিচিতার জন্য নিজের জীবন এভাবে বিপন্ন করবেন না। ভালোয় ভালোয় ওকে আমার হাতে তুলে দিন, নইলে কিন্তু........
- নইলে কিন্তু কী? আপনি ভাবলেন কী করে যে আমি উনাকে এতো সহজে আপনার হাতে তুলে দেবো? আপনাকে আগে আমার সাথে মোকাবেলা করতে হবে। 

এই যাহ! মোকাবেলার কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো। এখন কী হবে? ছেলেটার হাতে ছুরি, কিন্তু আমি তো নিরস্ত্র! যাই হোক, যা হওয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু মেয়েটার তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

-আপনি পেছনে ফিরে জোরে দৌড়ে পালিয়ে যান, আমি আপনার প্রেমিককে আটকে রাখার চেষ্টা করছি। আদ্রিতা.....আদ্রিতা, আপনি কি শুনছেন? আদ্রি........

আমি কথাটুকু বলে পেছনে ফিরতেই দেখি আদ্রিতা নেই! তিনি আবার পালালেন কখন? আর পালালেও তার পায়ের আওয়াজ তো শুনতে পেলাম না! তিনি তো পগারপার, এবার আমার কী হবে?

আমি ভয়ে ভয়ে সামনে তাকালাম। কিন্তু এ কি! ছেলেটাও উধাও। এরা প্রস্থান করলো কখন? কারো পায়ের আওয়াজই তো পেলাম না। আরেকটি ঘটনা ঘটলো! সামনে যে চায়ের দোকানটি দেখতে পাচ্ছিলাম সেটিও নেই। আমার গা ঘামতে শুরু করলো, ভেবে পাচ্ছি না কী করবো! হঠাৎ উল্টো দিক থেকে একটি রিকশাকে আসতে দেখলাম। রিকশাটিকে দাঁড় করালাম। রিকশাওয়ালা দেখতে কালো বর্ণের, মুখে আধপাকা চাপদাড়ি আছে। 

- ভাই, যাবেন?

রিকশাওয়ালা আমার দিকে নিষ্পলকভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর রিকশায় ওঠার জন্য ইশারা করলেন। আমি উঠে বসলাম।
তিনি ধীরেসুস্থে রিকশা চালাচ্ছেন। এভাবে রিকশা চড়তে ভালোই লাগছে। হঠাৎ রিকশার গতি বেড়ে গেলো মনে হচ্ছে! কোনো রিকশার গতিই এতো বেশি হয় না। আমি রিকশাওয়ালার পায়ের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। পাগুলো নেকড়ের পায়ের মতো! তিনি আমার দিকে তাকিয়ে একটি পৈশাচিক হাসি দিলেন! আমি তার চেহারার দিকে তাকাতেই দেখলাম চেহারা পরিবর্তিত হয়ে আদ্রিতার প্রেমিকের মতো হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম যে আদ্রিতাও আমার পাশে বসে আছে!

 

প্রথম প্রকাশ : ২৬ জুলাই ,২০১৭

 

​​​​✍  ইয়াসিন আরাফাত বিজয় 
এই বিভাগের আরও