মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রা সংকোচন; কি ও কেন

১১-৭-২০২০

This image is not found

 

পলাশ দেব রায়, ঢাবি প্রতিনিধিঃ মুদ্রাস্ফীতি। শব্দটি অর্থনীতিতে বহুল ব্যবহৃত।  বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বেশ কিছু দেশে এই মুদ্রাস্ফীতি নামক সংকট দেখা দিয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে ব্যাপক আকারে অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু কি এই মুদ্রাস্ফীতি? কেনই বা হয়?

 

কোন পণ্য বা সেবার মূল্য যদি বেড়ে যায় কিংবা টাকার (প্রচলিত মুদ্রা) বিনিময় মূল্য যদি কমে যায় অর্থনীতিতে তাকেই বলা হয়  মুদ্রাস্ফীতি। মোটা দাগে এটি হচ্ছে চাহিদা বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি । ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে কোন পণ্যের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি না হলে এমনটি ঘটে থাকে।  


আবার পণ্য বা সেবার উৎপাদন খরচ যদি বৃদ্ধি পায় তবে তার দামও বাড়ে। এই ব্যাপারটিকে বলে কস্ট পুশ ইনফ্লেশন । ২০০৮ সালে ব্রিটেনে এই মুদ্রাস্ফীতি দেখা যায়। এর কারণ ছিল বিভিন্ন আমদানি পণ্য যেমন তেলের মূল্য বৃদ্ধি যা অন্যান্য পণ্য উৎপাদনে বহুল ব্যবহৃত।   

 

কিভাবে টাকার মূল্য বাড়ে বা কমে? যখন বাজারে চাহিদার তুলনায় যোগানের ঘাটতি দেখা যায় তখন স্বাভাবিকভাবে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ঘটে। আবার যদি মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বেড়ে যায় তাহলেও পণ্য বা সেবার মূল্য বেড়ে যায়। 


সহজ একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ধরা যাক, কোন একটি বাজারে প্রতিদিন ১০০ কেজি চালের বেচাকেনা হয়। প্রতি কেজি চালের দাম ৪০ টাকা। এরকম অবস্থায় বাজারে ২০ জন ক্রেতা ৫ কেজি করে চাল কিনতে পারেন। অর্থাৎ, ৪০ টাকা করে ৫ কেজি চাল কিনতে প্রত্যেকের খরচ পড়ে ২০০ টাকা। এখন কোন কারণে বাজারে ২০ কেজি চালের সরবরাহ কমে ৮০ কেজি হয়ে গেল। কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা কমেনি। এরকম পরিস্থিতিতে দুইটি প্রভাব দেখা যাবে।


১. যদি সম বণ্টন রাখতে হয় তবে ২০ জন ক্রেতাকে ৪ কেজি করে চাল কিনতে হবে।
২. বিক্রেতারা চালের দাম বাড়িয়ে ৪০ থেকে ৫০ করে ফেলবে। 

 

অর্থাৎ দেখা গেল আগে যেই ২০০ টাকা দিয়ে ৫ কেজি চাল কেনা যেত এখন সেই ২০০ টাকা দিয়েই ৪ কেজি চাল কিনতে হচ্ছে। এতে করে টাকার পরিমাণ একই থাকলেও টাকার প্রকৃত মূল্য অর্থাৎ বিনিময় মূল্য কমে গেল। এই ব্যাপারটিই মুদ্রাস্ফীতি। 

 

মুদ্রাস্ফীতি অনেক কারণে ঘটতে পারে। দেশে কোন সংকট বা দুর্যোগ দেখা দিলে অনেক পণ্যের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। কারণ সংকট এড়াতে বেশিরভাগই প্রয়োজনীয় পণ্য বেশি পরিমাণে কিনে রাখতে চায়। এর সুযোগ নেয় একদল অসাধু ব্যবসায়ী। তারা বাজার থেকে সেই সকল পণ্য কিনে বিপুল পরিমাণে মজুত করে কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করে। তাই বাজারমূল্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ মুদ্রাস্ফীতি রোধের অন্যতম উপায়। তবে কোন একটি নির্দিষ্ট বাজারে কি কারণে মুদ্রাস্ফীতি ঘটছে বা ঘটবে তা উক্ত বাজারকে পর্যালোচনা করে বের করা হয়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে দেশের সরকার তখন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। 


যেকোন উন্নয়নশীল বা ক্রমোন্নতির অর্থনীতিতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সামান্য পরিমাণে মুদ্রাস্ফীতি থাকলে বরং তা দীর্ঘমেয়াদের জন্য সুফলদায়ক। কেননা এই রকম অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে বা টাকা বাড়ে। সেই অনুপাতে উৎপাদন ক্ষমতা যদি পাল্লা দিয়ে না বাড়ে তবে মৃদু আকারে মুদ্রাস্ফীতি বাজারের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। 

 

মুদ্রাস্ফীতির বিপরীত অবস্থাকে বলা হয় মুদ্রা সংকোচন বা ডিফ্লেশন। মুদ্রা সংকোচন হল মুদ্রা স্ফীতির হার যখন ঋণাত্মক হয়। সোজা কথায় বাজারে প্রচুর সরবরাহ আছে কিন্তু মানুষের হাতে তা কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা নেই। 

 

মুদ্রাস্ফীতির কিছু রকমভেদ আছে। যদি মুদ্রাস্ফীতি ধীরে ধীরে ঘটে অর্থাৎ হঠাৎ করেই দ্রব্য বা সেবার মূল্য অনেক না বেড়ে বরং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাকে বলে ডিসইনফ্লেশন । আবার মুদ্রাস্ফীতি হঠাৎ করেই আকাশচুম্বী হয়ে গেলে কিংবা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাকে বলে হাইপারইনফ্লেশন ।  

 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, মুদ্রাস্ফীতির ইংরেজি শব্দ Inflation হলেও আসলে এটি তার সঠিক ভাবার্থ পূর্ণরূপে প্রকাশ করে না। কেননা, Monetary inflation নামে আরো এক প্রকার মুদ্রাস্ফীতি রয়েছে। এই ক্ষেত্রে মানুষের হাতে প্রচুর টাকা থাকে কিন্তু দ্রব্যমূল্য লাগামহীন হওয়ায় তা কেনার সামর্থ্য থাকে না। এই ব্যাপারটি বুঝতে হলে কিভাবে মানুষের হাতে টাকা আসে সেটি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। আজকে না হয় এটুকুই থাক।