তরুণদের বিসিএস চিন্তা এবং হতাশা

৬-৭-২০২০

This image is not found

ইমামুল ইসলাম, কুবি প্রতিনিধিঃ
একযুগ আগেও শিক্ষার্থীদের চিন্তা ছিলো ক্লাসের পড়াকে ঘিরে। তাদের আগ্রহ ছিলো বিভিন্ন বই নিয়ে। ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে বিসিএস পড়ার এমন  চলও ছিলো না। চাকরির সম্মান, নিরাপত্তা আর ক্ষমতার কথা চিন্তা করে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিসিএস বা বড় কোন চাকরির পরামর্শ দিলেও অনেক সন্তানই শুনতো না। 

এরপরই পাল্টে গেলো পুরো চিত্র। আর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলো যার জন্য সবার আগ্রহ নতুন মোড় নিলো।প্রথমত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা।আর সবচেয়ে বড় যেটা তা হলো চাকরির নিরাপত্তা। দ্বিতীয়ত, কোন একটি বিসিএসে প্রথম হয়ে সুনাম অর্জন করা কেউ জনগণের সামনে আসলে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে  মোটিভেশনাল ভাষণ দিলেন এবং সেলিব্রিটি হয়ে ব্যাপক সম্মান পেলেন।সেইসাথে কোন একজন তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট হয়তো জনমুখী কিছু কর্মকাণ্ডের জন্য প্রচুর প্রশংসিত হলেন।আর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো আছেই কোন সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে কাউকে সেলিব্রিটি করার জন্য। তরুণদের মাথায় প্রবেশ করলো নতুন এক ধারণা।সরকারি চাকরি করেও সেলিব্রিটি হওয়া যায় তাহলে।যার মাধ্যমে পাওয়া যায় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা।এই ঘটনাগুলোর পর বিসিএস আর বিসিএস রইলো না।হয়ে গেলো জনপ্রিয়তা পাওয়ার টিকিট।বিভিন্ন ছোট দেশের জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে লাগলো বিসিএসে চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনসংখ্যা।এবার আসি মূল আলোচনায়। যারা বিসিএসে সফল হয়েছেন তাদের সম্মান জানাচ্ছি। আর যারা সফল হননি তাদের নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

বাংলাদেশে স্নাতক পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ করতে গড়ে বয়স হয়ে যায় ২৩ বছরের মত।বিসিএসের আবেদন পর্ব থেকে চূড়ান্ত ফলাফল আসতে সময় লাগে মোটামুটি আড়াই থেকে তিন বছরের মত। তারুণ্যের শ্রেষ্ঠ সময় ২৩ থেকে ৩০ বয়সটা বিনিয়োগ হয় এক ঝুঁকিপূর্ণ জনপ্রিয়তা বা সম্পদপ্রাপ্তির প্রতিযোগিতায়। যে জনপ্রিয়তা আছে এভারেস্টের থেকেও অধিক উচ্চতায়। যেখানে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ যেতে পারবে।বাকিরা গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে পরবে।কেউ উঠে দাড়াবে আবার কেউ বা হারিয়ে যাবে কালের অতলে।এই মানুষগুলোও কিন্তু মেধাবী ছিলো।হয়তো এই মেধার প্রকাশ ঘটাতে পারতো অন্য কোন ক্ষেত্রে। তারা হতে পারতেন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা,একজন নামকরা বিজ্ঞানী, দার্শনিক। কিন্তু তারা কেন পারলো না? এর উত্তরও আছে।

বিসিএস স্বর্গের সিড়ি হিসেবে আবির্ভূত হলেও সবাই সেদিকে সানন্দে পদযাত্রা করে না।অনেকেই বিসিএস দেয় অভিভাবকদের চাপে।আবার অভিভাবকদের উপরও একটা চাপ থাকে আর সেটা হলো সমাজের চাপ।সমাজে একজন কোটিপতি উদ্যোক্তার থেকেও একজন সরকারি চাকুরের সম্মান বেশি।কন্যাদানের ক্ষেত্রেও সমাজে  সরকারি চাকুরের গ্রহণযোগ্যতাই বেশি। সমাজ একজন সরকারি চাকুরের কাছে কন্যাদানে বেশি নিরাপত্তা অনুভব করে। সরকারি উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা আত্নীয়ের জন্মদিনে অনেক ঘটা করে শুভেচ্ছা জানানো হয় কিন্তু অন্য চাকরি করা একজন আত্নীয়ের বেলায় হয়তো মোবাইলে একটা মেসেজ পাঠানোর সময়ও হয়ে ওঠে না। নিজের আত্নীয় বা বন্ধু সরকারি চাকরি পেয়ে ক্ষমতা পাওয়া মানে নিজেকেও ক্ষমতাশীল মনে করে অনেকে। এর কারণ, আমাদের দেশে সরকারের চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের সেবা পেতে আমাদের দেশে ক্ষমতা প্রদর্শনের চল রয়েছে। সমাজ নানাভাবে অভিভাবকদের এসব ক্ষমতা আর জনপ্রিয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই সমাজের চাপে সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ বিসিএস দেন, দিতেই থাকেন। কিন্তু তারা যখন ব্যার্থ হন তখন সমাজ তাদের স্বান্তনা দিতে আসেনা বা তার বিপদে পাশে আসে না।বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোতে যে বিষয় পড়ানো হয় তার ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটানোর সুযোগ আমাদের দেশে অনেক কম। নিজের অধীত বিষয় অনেকাংশেই চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। আবার নিরাপত্তা, ভক্তি লাভ যদি হয় উদ্দেশ্য, তবে তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য হতাশাজনক।

এদেশে একজন গবেষকের গবেষণা দিয়ে মাতামাতি হয় না।একজন ব্যাবসায়ীর নিজের টাকায় কেনা বিএমডব্লিউ গাড়িও একজন বিসিএস ক্যাডারের সরকারি গাড়ির কাছে পানসে হয়ে যায়। শিক্ষা ক্যাডার পেয়েও অনেকে পুলিশ প্রশাসনের আশায় আবার বিসিএস দেন। এমন সমাজব্যবস্থায় বিসিএস না দিয়ে উপায় নেই। অনেকেই মনে করেন সিভিল সার্ভিসের লোকেরা জনগণের প্রভু। মনে রাখতে হবে তারা অবসরে গেলে তাদের আর খুঁজে 
পাওয়া যাবে না।

দেশের অনেক তরুণ বিসিএস চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভোগে এবং এই হতাশা তাদের জীবনীশক্তি ও আত্মবিশ্বাস শুষে নেয়। বিকল্প ঠিক করে রাখা উচিত। নিজের সেরা সময় বিসিএসের জন্য উৎসর্গ করা উচিত নয়।বিসিএস ছাড়াও অন্য চাকরি করে ভালোভাবে বাঁচা যায়।তথাকথিত সমাজের চাওয়া দিয়ে কিছু আসে যায় না। এটা অভিভাবকদেরও অনুধাবন করা উচিত। 

অন্যের সন্তানের সাথে নিজের সন্তানের তুলনা বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারি। এই মুহূর্তে নিজের পিতামাতার সন্তানের পাশে দাড়ানো খুব দরকার।

এই বিভাগের আরও