অচেনাকেও চেনা লাগার বিস্ময়কর অনুভূতি

৬-৭-২০২০

This image is not found

 

পলাশ দেব রায়, ঢাবি প্রতিনিধিঃ
প্রায়ই বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে আমাদের অনেকের কাছেই মনে হয় এই ঘটনাটি যেন আগেও ঘটেছে আমাদের সাথে। কিংবা কোন জায়গায় বেড়াতে গিয়ে মনে হয় এই জায়গাটি যেন খুব চেনা। যেন অনেকদিন আগেও এই স্থানে আসা হয়েছে। যেন একই ঘটনা বারবার ঘটছে। কিন্তু সেই ঘটনা বা জায়গার কথা পুরোটা মনে না পড়ার কারণে একটা আক্ষেপ থেকেই যায়। 

অনেকদিন ধরেই অমিমাংসিত এই অনুভূতিকে বলা হয় 'দেজা ভু'। এটি ফরাসি শব্দ যা সর্বপ্রথম ফরাসি জার্নাল 'ফিলোসফি' তে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন ফরাসি প্যারা সাইকোলজিস্ট এমিল বইরাচ। ১৮৭৬ সালে। 


তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। বইরাচের একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিমূলক স্মৃতির সম্মুখীন হওয়া বিষয়টির নির্দিষ্ট নাম তিনি উল্লেখ করে গেলেও বিষয়টির ভালো ব্যাখ্যা তার সময়ে দেয়া যায়নি। কেউ কেউ এটার সাথে পুনর্জন্মের সাদৃশ্য খোঁজেন। আবার কেউ তো এটিকে আধিভৌতিক কিংবা অতিপ্রাকৃত তত্ত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। 


কিন্তু বিজ্ঞানীরা একাধিক গবেষণা করে দেজা ভু'র বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পাবার চেষ্টা করেছেন।  চিকিৎসা বিষয়ক গবেষকরা দেজা ভু কে দুটি মাত্রায় ভাগ করেছেন।


একটি  প্যাথোলজিক্যাল ও অপরটি নন-প্যাথোলজিক্যাল। প্যাথোলজিকাল দেজা ভু'র সাথে তারা এক ধরণের মৃগীরোগের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। এই ধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী একটা সময় ধরে দেজা ভু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান।


তবে আমরা অধিকাংশই যে ক্ষণিক বা অল্প সময়ের জন্য এমন অনুভূতির মুখোমুখি হই তা মূলত নন-প্যাথোলজিক্যাল দেজা ভু।  গবেষকেরা দেখেছেন, যাদের প্রচুর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে কিংবা প্রচুর সিনেমা দেখে থাকেন তাদের এই ঘটনার পুনরাবৃত্তির অভিজ্ঞতা বেশি হয়ে থাকে। 


তবে মস্তিষ্কের কোন অংশটি দেজা ভু'র জন্য সরাসরি দায়ী তা বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলার মতো অবস্থায় এখনো পৌঁছাননি। কয়েকটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণে যেমন কতিপয় সর্দি-জ্বর নিরাময়ের ওষুধ গ্রহণের সময় গ্রহণকারীর দেজা ভু অনুভূতি হবার ঘটনা দেখা যায়। মানব শরীরের কোন জিন দায়ী কি না তা জানা না গেলেও দেহ কোষের  ১০ নং ক্রোমোজোমের CG-II জিনের সংশ্লিষ্টতা দেখতে গবেষণা চলছে। 


২০১২ সালে 'কনশাসনেস এন্ড কগনিশন' নামের জার্নালে প্রকাশিত রিপোর্টে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে এটির কারণ ব্যাখ্যা করা হয় এবং গবেষকরা একই জায়গায় ঘটা ভিন্ন দুটি ঘটনার সাথে দেজা ভু অনুভূতি হবার তীব্রতা লক্ষ্য করেন। 


অনেক বিজ্ঞানীর মতে, আমাদের মস্তিষ্ক স্মৃতিকে শুধু গেঁথে রাখে না। বরং মস্তিষ্কে স্মৃতি চলে একটা ভাঙা গড়ার প্রক্রিয়ায়। বিভিন্ন অস্বাভাবিক ঘটনা, নতুন অভিজ্ঞতা, বিচ্ছিন্ন অনুভূতি ইত্যাদি সব কিছু মিলে আমাদের স্মৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। তাই অনেক সময় অনেক পরিচিত এবং জানা তথ্যও আমরা মনে করতে পারি না। এই ব্যাপারটির সাথে ক্রিপ্টোমেনশিয়া নামে একটি মানসিক অবস্থার মিল আছে। দেজা ভু' এই ক্রিপ্টোমেনশিয়ারই এক রূপ যেখানে মস্তিষ্কে সংরক্ষিত স্মৃতি আমরা মনে করতে পারি না। 


১৯৬৪ সালে রবার্ট এফরন নামে এক গবেষক বলেন, মস্তিষ্কের হেমিস্ফিয়ারে প্রক্রিয়ার পূর্বে টেমপোরাল লোব অংশে কোন স্মৃতি দুইবার প্রবেশ করে। এই প্রবেশের সময় যদি কোন হেরফের ঘটে তবে দ্বিতীয় সিগন্যালটি প্রথমটির পুনরুজ্জীবন করে। আর তখনই পুরো ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখা দেয়। 

দেজা ভু'র বিপরীত আরো একটি অনুভূতি হয়। সেটি হলো 'জামাইস ভু'। 'জামাইস ভু' হলে অনেক পরিচিত মানুষকেও আপনার অচেনা বলে মনে হবে। 


তাই ম্যাট্রিক্স সিনেমায় দেজা ভু' ম্যাট্রিক্সের একটি ত্রুটি হলেও বাস্তব জীবনে এটা ভেবে রোমাঞ্চিত না হওয়াই ভালো। আর যদি মনে করেন, প্যারালাল ইউনিভার্স পরস্পর ধাক্কা খাবার সময় এই অনুভূতি হচ্ছে, তাহলে ৯৯৯ এ ফোন দিতেই পারেন বিশ্বকে বাঁচাতে!