করোনাকালে অর্থনীতি ও প্রশাসন

৩-৭-২০২০

This image is not found

 

পলাশ দেব রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিঃ
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ক্রমবৃদ্ধির কালে আমাদের সামনে হঠাৎ করে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই আঘাত হেনেছে করোনাভাইরাস।  অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে পুঁজি করে সরকারি তরফ থেকে প্রচারণা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় সামাল দেবার মতো অবস্থা আমাদের যে নেই তা অস্বীকারের কোন অবকাশ অন্তত এই মুহূর্তে নেই। 
গত এক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকার শিল্প, বৈদেশিক বিনিয়োগের হার, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ ইত্যাদির ওপর ভর করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি দেখানো হলেও করোনার বিশ্বব্যাপী আক্রমণ আমাদের স্পষ্টরূপে দেখিয়ে দিচ্ছে যে প্রকৃত অর্থে সমাজের কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিত্ত ও সম্পদ বেড়েছে। এক বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর আসলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের ভরণপোষণের সামর্থ্য সৃষ্টি হয়নি। পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশের জিডিপির প্রায় ১৫ ভাগের সরবরাহ এখন নেই বললেই চলে।

অনেকগুলো বিতর্কিত ঘটনায় সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিকটু অবস্থার সৃষ্টি করেছে সরকারি প্রশাসন । ডিসেম্বরের দিকে চীনের উহান থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সময় সরকার বিমান চলাচলের ওপর কোনরূপ নিষেধাজ্ঞা কিংবা ভাইরাসবাহী রোগী শনাক্ত করার ওপর তেমন কোন গুরুত্ব দেয়নি। এটা অবশ্যই সত্য যে উদ্ভুত পরিস্থিতি সমগ্র বিশ্বের কাছেই নতুন এবং উন্নত বিশ্বের অনেক দেশই সময়ের সাথে যথাযথভাবে বিষয়টিকে বুঝতে পারেনি বা বুঝলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু অপ্রতুল সামর্থ্যকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারার দায় প্রশাসন কোনভাবেই এড়াতে পারে না। আমাদের ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা বলে অভিহিত স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও জরুরি সেবার তৎপরতা বৃদ্ধি করে দেশের উপজেলা পর্যায় পর্যন্তও আমরা সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত করতে পারিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা তাদের দক্ষতার পাশে বড় প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।  

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের মাধ্যমে দেশে ভাইরাসটির বিস্তার রোধে লকডাউনের ধারাবাহিক পর্যায় শুরু করা হয়। বিগত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত একাধিক অদূরদর্শী পদক্ষেপ ভাইরাসটির বিস্তার সারা দেশে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। পোশাক কারখানাগুলো বন্ধের পর আবার খুলে দেয়ায় সাধারণ শ্রমিকদের রাজধানীতে ফিরে আসা, আবার হুট করেই বন্ধ ঘোষণার ফলে বাড়ি ফিরে যাওয়া, পরিবহণ ব্যবস্থা না থাকায় শ্রমিকদের বাড়ি ফিরতে ভোগান্তি, সরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে দেশের বেহাল দশার অবস্থা উন্মোচন ইত্যাদিতে প্রতীয়মান হয় যে দেশের উন্নয়ন অবকাঠামো একটা দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন দেশের মানুষের দল, মত, নির্বিশেষে সকলের সচেতনতা ও সহযোগিতার মনোভাব। ঢালাও ভাবে সরকার কিংবা কোন এক পক্ষকে দোষারোপ করলে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাওয়া যে আমরা দেখতে পাচ্ছি এটার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হতেই থাকবে। 

সরকারি প্রশাসন যে কাজ করছে না তা নয়। মহামারী সামলাতে তারা তৎপর হলেও তার মধ্যে সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ও মৃত্যুবরণ করেছেন। বেশির ভাগ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা রোগাক্রান্ত হচ্ছেন। ৩ জন সচিবসহ প্রায় ২১১ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।  

তবে সার্বিকভাবে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার হালচাল আমাদের প্রতিনিয়ত হতাশ করছে। সরকারি  সাহায্য ও প্রণোদনা কার্যক্রমের সিস্টেম লস, ক্রয় সম্পর্কিত আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ, কর্তব্যে অবহেলা, দুর্বল পরিকাঠামো, উপকরণগত সীমাবদ্ধতা অনেকগুলো মুখ্য সমস্যার সম্মুখীন আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থা। সেই সাথে জনগণের কাছে মানসম্মত জবাবদিহিতার ঘাটতি প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে।

মানুষ না অর্থনীতি? বিএমএ মহাসচিব এহতেশামুল হক চৌধুরীর ডয়চে ভেলে কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "জীবন বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, কিন্তু অর্থনীতি ধ্বসে গেলে মানুষের বড় বিপর্যয়।" আসলে ঘরে বসিয়ে রেখে মানুষকে খাওয়ানোর সামর্থ্য আমাদের তেমন নেই।  থাকলেও আপৎকালীনের জন্য। দীর্ঘমেয়াদী সময়ের জন্য এটি করলে তার সুফল গরীবরা ভোগ করতে পারে না। বস্তুত যে কোন সহায়তা কার্যক্রমে সঠিক মানুষ নির্ধারণ করা সহজ বিষয় নয়। স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী প্রতিনিধিদের দ্বারা এই গোষ্ঠী নির্বাচন দারুণভাবে প্রভাবিত হয়।  প্রতিযোগীতায় প্রভাবশালী ও ধনীদের সাথে গরীবেরা পেরে ওঠেনা। আবার কম গরীবদের সাথে বেশি গরীবেরা পেরে ওঠেনা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ত্রাণ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। আমাদের অর্থনীতির পরিকাঠামো এমন হওয়া উচিত ছিল যেন প্রতিটি মানুষ নিজের কর্মসংস্থানের উপায় নিজেই করে ফেলতে পারে। এতে করে নিজের ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সরকারি ত্রাণের মুখাপেক্ষী হতে হত না।

হঠাৎ করে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিতে বেশ জোরালো একটা ধাক্কা যে লেগেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে গত ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সার্বিক অর্থনীতির প্রায়  এক লক্ষ দুই হাজার তিনশত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং দেশের প্রধান খাতসমূহ যেমন কৃষি, শিল্প, সেবা খাতে এ ক্ষতির পরিমাণ ৩৩০০ কোটি টাকা।  বছরের শুরুতে সরকারি তথ্যমতে প্রবৃদ্ধি ৮.২% হবার কথা থাকলেও বিশ্বব্যাংক বলছে করোনার ধাক্কায় দেশের প্রবৃদ্ধি ২-৩ শতাংশে নেমে যেতে পারে। 

সকল ক্ষতি ও বিপদের পরিসংখ্যানকে সামনে রেখে সরকারের উচিত দেশের জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। শুধু কঠোর স্বাস্থ্যবিধি পালনের কথা বলে হবে না। ভাইরাসটি বাংলাদেশে যে পরিমাণে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে করে শক্তিশালী পরিকল্পনা ছাড়া কোন আপাত সিদ্ধান্ত ভালো ফল বয়ে আনবে না। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সর্বনিম্ন পরিমাণ বরাদ্দ দিয়ে তথাকথিত উন্নয়ন আশা করা বোকামি। জনগণের স্বাস্থ্য দেশের অনেক বড় সম্পদ। আমাদের সক্ষমতাকে বাড়াতে দরকার পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।তাহলে আশার পথ কি?  বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশে অর্থনীতি ঠিক রাখতে হলে অসংখ্য সমস্যা ও জটিলতার সৃষ্টি হবে। কিন্তু তার সমাধানের পথ হলো দেশের মানুষের মধ্যে শাসকের প্রতি ভরসার সৃষ্টি হওয়া । এজন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো কার্যকরী হতে হবে। আমলাতন্ত্রকে সর্বজ্ঞানী অবস্থা থেকে বের হয়ে বিশেষজ্ঞের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেকোন সিদ্ধান্ত বড় পর্যায়ে প্রয়োগের আগে প্রথমে ছোট এলাকাভিত্তিক টেস্ট চালিয়ে তার সক্ষমতা পর্যালোচনা করতে হবে।  সরকারের প্রতিটি কাজের জবাবদিহি করতে হবে। অন্যায় ও ভুলকে স্বীকার করতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে গৃহীত ব্যবস্থার আশাব্যঞ্জক রূপ জনগণের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে। 

এক সুন্দর সকালের অপেক্ষায় আমরা সবাই। প্রশ্নটা হলো আলো আসতে কতটা দেরি?